সৌভিক গুহসরকারের কবিতা
রাধানগর
ঘরে শুধু নুন আর জল, তবু এ অন্নপূর্ণা সমুদ্রিকার রূপের শেষ নেই। এইখানে, সাদা বালির চরে বসে মনে হয়, মাছ হলে বেশ হত। শরীরের যাবতীয় সাঁতার খুলে দেওয়া যেত ওই প্রবালের সৌম্যকান্ত নগরে। জলের নিচে নক্ষত্র, জলের ওপরে নক্ষত্র। মাছ জলের পাখি। নারকোল পাতার মতো ডানা আসুক আমার শরীরে . . .
রাধানগরের সাদা তীরভূমি সাগরমহুয়ার মহিমায় ঝিমঝিম করে। শ্বেতাঙ্গিনীদের গোলাপী স্তনে বালি ঝরে। তারা সোনালি চুলের গুচ্ছ খুলে ছড়িয়ে রাখে শরীরের বহুপঠিত গ্ৰন্থির মতো।
বিকেল হলে কাঁকড়ার দল বেরয়। অসংখ্য ঘাসের মতো। গর্ত থেকে গর্তের দিকে ছুটে যায়। টান দেয় একে অপরকে। তবু রূপ, অনন্ত আর সমুদ্রের দিকে যায় না। ঢেউ এলে গর্তে ঢোকে, পাছে ভেসে যায় . . .
বিখ্যাত উপমা বলে কাঁকড়ার সঙ্গে বাঙালির মিল আছে। যদিও এ সংবাদ কাঁকড়ারা জানে না।
সমুদ্রের শান্ত কিনারে
বিপুল সমুদ্রের কিনারে জেলেদের নৌকার মতো ভেঙেচুরে বসে থাকলে বোঝা যায়, এ জীবনে কতটা অপচয় হল। কতটা সময় নষ্ট হল ঢেউয়ের বনের অন্ধকারে― অনেক কিছু করব ভেবে, কিছুই না করে।
এখানে ভূমি নেই, শুধু টুকরো চিন্তার মতো দ্বীপপুঞ্জ। কোথাও আন্দামান, কোথাও নিকোবর, কোথাও জারোয়া, কোথাও সেন্টিনেল, কোথাও সারস। এমন দ্বীপও আছে যেখানে কেউ নেই।
অপ্রকাশিত দ্বীপের কষ্ট হয় বুঝি অপ্রকাশিত কবিতাদের মতো? সমুদ্রের খাতায় বহুকাল, তবু মুদ্রিত নয় সে। এই নিয়ে ব্যথা, ক্ষোভ, ক্লান্তি আসে? অথবা সে নিশ্চিন্ত। ছাপা হয়নি বলে পৃথিবীর কদর্য বাজার দেখেনি তাকে। সে প্রকৃত বিশুদ্ধ কবিতা, যার কবিতা হয়ে ওঠা ছাড়া অন্য কোনও দায় নেই আর।
আজ নক্ষত্রময় ডানা নিয়ে আবার উড়ছে আকাশ। যে সব নারীরা চলে গেছে, তারা আমার পাটলীপুত্রের ঝিমঝমে তমসায় ফিসফিস করে। তাদের রূপ এঁকে যেতে চাই। তাদের সেই ছায়াময় শরীরতলা― ভেজা শাড়ির ভেতর জ্বলে ওঠা প্রাচীন লন্ঠনের আলো― সেই সব বিখ্যাত হাসির পুকুরপাড় . . .
হেমেন মজুমদার থেকে ফিরে এসে বুঝেছি― এ বঙ্গসমাজে যামিনী রায় হওয়া বেশি নিরাপদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন