অঙ্কিতা সরকারের গল্প
তমসা হতে
#প্রাক-কথন
খুট করে একটা শব্দ হওয়ার সাথে সাথেই কাঠের দরজার ক্যাঁচ করে মৃদু একটা শব্দ হল। নিস্তব্ধ রাত্রির শান্তিকে সামান্য বিঘ্নিত করেই তা ক্ষান্ত হল অবশ্য। দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একটি নারী মূর্তি। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না। শুধু চাঁদের সামান্য আলোয় তার আবছা অবয়ব দেখে তাকে নারী মূর্তি বলেই মনে হয়।
চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখে সে নারী মূর্তি নিঃশব্দ অথচ দ্রুত পায়ে পথ চলতে থাকে। কদিন ধরেই গ্রামে বৃষ্টি হওয়ার ফলে মাটির পথ কর্দমাক্ত। পা সেই নরম কাদার তালে বসে যাচ্ছে! তবু সাদা থানে কাদা মেখেই সে নারী মূর্তি দ্রুত এগোতে থাকল।
সমবেত স্বরে ডেকে উঠে একদল শেয়াল প্রহর শেষের ঘোষণা করল। রাত্রির নিস্তব্ধতাকে এভাবে খান খান হতে দেখে একবারের জন্য থমকে দাঁড়াল সেই নারী। কিন্তু তা ওই মূহুর্তমাত্রই। এই কাজে বাধা আসবেই। কিন্তু তাই বলে তাকে থেমে থাকলে যে চলবে না! থেমে গেলেই যে অভীষ্ট থেকে অনেক দূরে চলে যাবে সে!
নির্দিষ্ট থানে উপস্থিত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে শ্বাস নিল সে। বয়স হয়েছে, জোয়ান বয়সের মত তৎপরতা আর দেখানো চলে না।
খানিক জিরিয়ে নিয়ে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল একটি নির্দিষ্ট দিক লক্ষ্য করে। পুরোনো ভাঙা একটি মন্দির। মন্দিরের চূড়ো, সিঁড়ির ধাপ সবই কালের নিয়মে ভেঙে পড়েছে। গায়ে গজিয়েছে বট অশ্বত্থের শিকড়। দেখলেই বোঝা যায়, এ মন্দির পরিত্যক্ত। কিন্তু এমন এক মন্দিরে কি করছে রায় বাড়ির ছোট গিন্নী?
পায়ে পায়ে মন্দিরের পিছন দিকে উপস্থিত হয় সে। লোকচক্ষুর আড়াল হতে হাতে রেড়ির তেলের প্রদীপটুকুও নিয়ে আসেনি! পিছন দিকে গিয়ে একটি মূর্তির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল সে। চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে, দেবী মূর্তির গায়ের রঙ মিশমিশে কালো। উচ্চতা পূর্ণাঙ্গ মানুষের একহাতের সমান। দেবী মূর্তির এক হাতে ঝাঁটা ও অন্যহাতে ধরা কুলো। দেবীর গাধার পিঠে আসীন।
ধীরে ধীরে এক কুটিল হাসি ফুটে উঠল সেই নারীর মুখে। ছোট্ট শিশুর মত সেই মূর্তিকে কোলে তুলে নিয়ে ফেরার পথ ধরল সে।
অতটা পথ অতিক্রম করে এসে হাঁফিয়ে গেল সে। এই জমিদার বাড়ির লাগোয়া পরিত্যক্ত নদীর ঘাটেই কাজ ছিল তার। তবু রায়দের এই বাড়িটাও তো নেহাত ক্ষুদ্র নয়! পুরো দশ বিঘা জমির উপর দাঁড়ানো এই জমিদার বাড়ির পূর্বদিকেই রয়েছে ঠাকুর মন্দির। নিত্যদিন এখানে মা লক্ষীর পুজো হয়। প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষীর পাঁচালি সহযোগে ঘট পাতা হয়। আর প্রত্যেক পূর্ণিমায় গাঁয়ের লোক পাত পেড়ে প্রসাদ পায়।
রায় বাড়ির প্রত্যেকে এমনকি গাঁয়ের প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে, রায়েদের এই ভাঁড়ার উপচে পড়া অবস্থা শুধুমাত্র এই মা লক্ষীর আশীর্বাদ। চঞ্চলা মা লক্ষী এই বাড়িতে এসেই থিতু হয়েছেন।
রায় বাড়ির ছোট গিন্নী এখন সেই মন্দিরের সামনে এসেই দাঁড়ালেন। চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখে নিলেন, কেউ তাকে দেখছে না তো! অন্যের অনুপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়েই মন্দিরে প্রবেশ করলেন তিনি। ক্ষিপ্র হাতে বেদী থেকে নামিয়ে আনার সময় বুকটা কেঁপে উঠল তার। পাপ হবে না তো কোনো?
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। হলে হবে। তার আবার পাপের ভয় কীসের? জগত সংসারে তার আছেটাই বা কে? ইহকাল যার ঝরঝরে হয়ে গেল, তার আবার পরকালের ভয় কীসের?
বেদীতে বসিয়ে দিলেন কোলের মূর্তিটি। রায় বাড়ির লক্ষীর বেদীতে স্থান পেল অলক্ষী। মন্দির থেকে কোলে করে নিয়ে এলেন মা লক্ষীর মূর্তিটা। তাকে নিয়ে পৌঁছলেন সেই পরিত্যক্ত মন্দিরের কাছে। মূর্তিটাকে ওইখানে বসিয়ে ফিরে আসতে যাবেন, সেই সময়েই টান পড়ল তার আঁচলে।
বুকের ভিতরটা কেমন হু হু করে কেঁপে উঠল তার। ভয়ে বিস্ফারিত দৃষ্টি নিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়েই ধপ করে সেই কাদা ভরা মেঝেতে বসে পড়লেন তিনি। অলক্ষী যে নিজের স্থান কখনো শূণ্য রাখে না!
আর ঠিক সেই সময়েই রায় বাড়ির মূল দরজার মাথায় লাগানো, টাটকা তাজা সাতটা লেবু ও লঙ্কা সম্বলিত সুতোটা বিনা আঘাতেই ছিঁড়ে পড়ে গেল।
রায় বাড়িতে অলক্ষী প্রতিষ্ঠা পেল।
পর্ব-এক
ঘুমের মধ্যেই একটা অস্বস্তি হল আমার। মনে হল, কেউ যেন আমার মুখের একেবারে উপরে ঝুঁকে আমায় দেখছে! আমি চোখ খোলার চেষ্টা করছি কিন্তু আমার চোখের পাতার উপর যেন এক মণ ভারী কিছু চাপিয়ে দিয়েছে কেউ! একটা চোরা আতঙ্ক ঘুমের মধ্যেও অবশ করে দিল আমায়। এই ডিসেম্বরের ঠান্ডার মধ্যেও কপালে বিনবিনে ঘাম ফুটে উঠছে, আমি বুঝতে পারছি! সেই মুখটা এখনও তাকিয়ে আছে আমার দিকে!
শরীরের সমস্ত শক্তি, মনের সব জোর একসাথে একটা বিন্দুতে থিতু করে আমি চোখ খুলে ফেললাম। অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হল না। তবু বুঝতে পারলাম, আমি আমার পরিচিত পরিবেশে নেই। প্রচন্ড এক ভয়ে উঠে বসলাম আমি। অন্ধকারটা ধীরে ধীরে সয়ে আসতে চোখে পড়ল, ঘরের মধ্যেকার পুরোনো ভারী কাঠের আয়না দেওয়া ড্রেসিং টেবিল, ছত্রী লাগানো পুরোনো খাট, একটা আলমারী।
আমার মনে পড়ে গেল, আমি এখন আছি আমাদের দেশের বাড়ি বিলাসগড়ের রায় বাড়িতে। কথাটা মনে পড়তেই, নিশ্চিন্ততার এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আমায় ঝাপটা মেরে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখলাম, পরম নিশ্চিন্তে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে অবিকল আমারই মত দেখতে একটা মেয়ে। নাহ, এটা ভয় পাওয়ার মত কোনো ঘটনা নয়। কারণ পাশে যে শুয়ে আছে, সে আমার জমজ বোন মৌতৃষা।
বিলাসগড়ের এই বাড়িতে আমরা আজ যখন এলাম তখন বাজে বেলা বারোটা। পাঁচ ঘন্টার গাড়ির ধকল সত্ত্বেও অচেনা জায়গায় ঘুম আসতে দেরীই হয়েছিল। এখন আবার ঘুমটাও ভেঙে গেল! মাথার কাছে হাতড়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম, রাত আড়াইটে বাজে। বাইরে যেতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু ক্লান্তিটাও একইসাথে এসে গ্রাস করল। আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালবেলা ঘুম ভাঙল মুখে রোদ পড়ে আর পাখিদের কিচিরমিচির কলকাকলিতে। অনেকদিন পরে পাখিদের ডাক শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল আমার। যাদবপুরে আমাদের বাড়িতে তো চোখ খুললে ইট-কাঠের জঙ্গল আর চোখ বন্ধ করলেও তাই। তিউ উঠে পড়েছে। ঘরের বাইরে অনেকের গলা শুনতে পাচ্ছি। আর শুয়ে থাকা চলে না।
আমার তেইশ বছরের জীবনে আমি এই প্রথম এই বাড়িতে এলাম। অবশ্য শুধু আমি নয়, আমার অন্যান্য ভাই-বোনেরাও এই প্রথমই এখানে এলো। বিলাসগড়ে এত বড় বাড়ি, এত সম্পত্তি থাকার পরেও আমার ঠাকুরদা আর ছোট ঠাকুরদা যে কেন কলকাতায় বাসা বাঁধল তা আমরা কেউই জানি না।
যাদবপুরের ওই বাড়িটাও দু টো সমান ভাগে ভাগ করা। একটা ভাগে আমরা মানে আমার বাবা, জ্যেঠু তাদের পরিবার নিয়ে থাকে আর অন্য ভাগটায় ছোট ঠাকুরদার তিন ছেলে তাদের সংসার নিয়ে থাকে। একই বাড়ির দুটো অংশে থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে সদ্ভাব নেই বিশেষ। অনুষ্ঠান বা পুজো-পালিতে আসা যাওয়া আছে যদিও, তবে সেটা লোক দেখানো।
তবে মা-কাকি-জ্যেঠিদের মধ্যে তরকারির বাটি আদানপ্রদান কিংবা শীতের দুপুরে ছাদে পা ছড়িয়ে বসে আড্ডা দিতে ছোটবেলা থেকেই দেখেছি।
এই বছর আমরা এসেছি আমার ঠাকুমার বাৎসরিক কাজ করতে। মৃত্যুশয্যায় ঠাকুমার ইচ্ছে ছিল, তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এই বাড়িতে হবে। কিন্তু আমার জ্যেঠুর পা ভেঙে যাওয়ায় সব কাজ কলকাতার বাড়িতেই হয়েছিল। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের বদলে বাৎসরিক কাজ হবে এই বাড়িতে। তারপর কালিপুজো এখানেই কাটিয়ে ফিরে যাব আমরা।
ও তরফের কাকা-জ্যেঠাদের আসার ইচ্ছে ছিল না এখানে। আসলে এই বাড়িতে তাদের একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে তার জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন আমার ঠাকুরদা। তবে তাঁরা কেউই আর বেঁচে নেই। সবাই একে একে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর ঠাকুমা একা একা আক্ষেপ করতেন। কীসের জন্য আক্ষেপ তা আমরা জানতে পারিনি।
মৃত্যুশয্যায় মাতৃস্থানীয় একজনের অনুরোধ ফেলতে ওদের বেধেছিল বোধহয়। তাই আমাদের সাথে ওরাও এসেছে।
আমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু সবার মুখ দেখে থমকে গেলাম আমি। সবাই যেন উত্তেজিত হয়ে আছে। আর এই বাড়ির পুরোনো কেয়ারটেকার রাখহরি দাদুর মুখে খেলা করছে আতঙ্ক। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-"কি হয়েছে?"
কেউ কোনো উত্তর দিল না। মেজ কাকি শুধু আঙুল তুলে একটা দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল আমার। আমি স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে।
#পর্ব-দুই
-"এই, এই অপু দাদা ওইদিকটা চলো। চলো না!"
-"ওইদিকে কি করতে যাবি? ওটা তো পুরো জঙ্গল!"
-"জঙ্গল? বাঘ দেখতে পাব?"
পিকলুর কথা শুনে আমরা সমস্বরে হেসে উঠলাম। আমাদের ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পিকলু আর সবচেয়ে বড় অপুদাদা। সকালবেলা লুচি আর আলুর দম সহযোগে জলখাবার সেরে নেওয়ার পর আমরা সব ভাই বোনেরা মিলে দল বেঁধে ঘুরতে বেরিয়েছি।
এখানে প্রকৃতি একেবারেই আলাদা। চারপাশে মাথা উঁচু করে সম্ভ্রমের সাথে দাঁড়িয়ে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠালের গাছ। কলকাতায় এত গাছ একসাথে দেখিনি বলেই সেসব দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম আর উঁচু নীচু রাস্তায় হোঁচট খাচ্ছিলাম। অবশ্য শুধুই যে দেখছিলাম তা বললে ভুল হবে। গলায় ঝোলানো ডিসিএলআর এ সব মূহুর্ত বন্দী করে রাখছিলাম।
পিকলুর ডাক শুনে অপুদাদা ফোন থেকে নজর সরিয়ে বিরক্ত মুখে ওর দিকে তাকাল। আসলে দাদা এখন নিজের হবু বউয়ের সাথে এই রোম্যান্টিক পরিবেশে কথার জাল বুনতে ব্যস্ত। পরের বছরেই ওদের বিয়ে। সেখানে পিকলু এমন বেরসিকের মত অপুদাদার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিলে সে বিরক্ত তো হবেই!
দাদা পিছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"এই পিউ, সারাক্ষণ চোখে ওই গাবদা ক্যামেরাটা না লাগিয়ে রেখে ছোট ভাই-বোনগুলোর খেয়ালও তো রাখতে পারিস! কিছুই দেখছি পারিস না।"
আমি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলাম। দাদার পরেই আমি এই বাড়িতে বড়। তাই ছোট ভাই বোনগুলোর সামনে দাদার মুখে মুখে কথা বলি না আমি। কিন্তু আমার বোন বলে। এখনও তাই তিউ বলল,
-"ওটা এখন থেকে তুই-ই প্র্যাক্টিস কর। কয়েক বছর পরে তোরই কাজে লাগবে!"
দাদার চাটি ধেয়ে আসার আগেই মৌতৃষা ছুটে গেল। ওর পিছন পিছন পিকলুও ছুট লাগাল। সকলকে ইয়ার্কির মুডে দেখে সকালের দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি মিলল যেন।
ঘুম থেকে ওঠার পরে বাইরে বেরিয়ে মেজ কাকিমার দেখানো দিকে তাকিয়েই আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। গতকাল রাত্রে স্বপ্নে যে মুখটাকে আমি আমার ঝুঁকে থাকতে দেখেছিলাম, মূর্তিটার মুখ ছিল অবিকল সেই একরকম!
লোলচর্ম এক বৃদ্ধার মুখ। মুখে অসং্খ্য কাটাকুটির মত বলিরেখার জন্য আরো ভয়ঙ্কর দেখতে লাগছে সেই মূর্তিটাকে। আর সবকিছুর পরে সেই চোখ! চোখ দুটো ধক ধক করে জ্বলছে, যেন জীবন্ত সে মূর্তি।
রাখহরি দাদুই প্রথম কথা বলেছিল। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,
-"এ.... এটা এখানে ক্ক.... কী করে এলো? কে এনে রাখল এটাকে?"
এই প্রশ্ন আমাদের সবার মনেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু কারো কাছেই এর উত্তর ছিল না। মূর্তিটাকে দেখে মনে হচ্ছিল, অনেকদিন মাটির নীচে ছিল এটা। সদ্য মাটি খুঁড়ে কেউ এটাকে বের করে এনেছে। মূর্তিটার সারা শরীরে ঝুরো ঝুরো মাটি লেগে ছিল।
মা জিজ্ঞেস করল,
-"কিন্তু এটা কীসের মূর্তি? এরকম কোনো মূর্তি আগে তো কখনো দেখিনি! কি গো বড়দি?"
মায়ের বড়দি অর্থাৎ আমার জ্যেঠিমা বলল,
-"সেটাই তো আমিও ভাবছি রে। যাক গে যাক, বাড়িতে কোনো কারণে মূর্তি এসেছে, তাকে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না, পাপ লাগবে। রাখহরি কাকা, পুরোহিত এলে তুমি বরং মূর্তিটাকে সাফ করে ঠাকুরঘরে তুলে রাখতে বোলো।"
-"ও মূর্তি বাড়িতে রাখতে নেই গো বউমা, সংসার যে ছারখার হয়ে যাবে! সব শেষ হয়ে যাবে!" কাঁপা গলায় বলেছিল দাদু, "ও যে অলক্ষী গো, অলক্ষী! এতদিন মাটির নীচে ছিল, কে তাকে উপরে তুলে আনল?"
কে আনল তার আর মীমাংসা হল না। মায়েরা সবাই শুনে বলল,
-"বেশ পুজোই যখন করা যাবে না, তখন তাকে কোথাও একটা রেখে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করো।"
দাদু তা করতেই চলে গেল। আর আমরাও খেয়ে দেয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা ঘাটের কাছে এলাম। জল এখন অনেক নীচে। আগে এখানে নিয়মিত বাসন মাজা, কাপড় কাচা হত। বাড়ির বউদের স্নান করার জন্য অন্য একটা ঘাট ছিল নাকি! দূর দূর থেকে নৌকা বোঝাই জিনিস এসে এই ঘাটে ভিড়ত। গয়নার নৌকা, ডিঙি নৌকা, পালতোলা কত সব নৌকার নাম কাল রাখহরি দাদু বলেছিল! এখন সেই নদীও নেই, আর তাই নৌকাও নেই।
মূল জমি থেকে সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা নীচে নামলে তবে পা ডোবানো জল পাওয়া যাবে। পলি পড়ে পড়ে নদীর জল গেছে শুকিয়ে। এখন বিলাসগড়ও অনেকটাই উন্নত। মোটর দিয়ে জল তুলে সেই জলেই সব কাজকর্ম সারা হয়। একদা বহুল ব্যবহৃত ঘাটও তাই এখন পরিত্যক্ত।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসবই ভাবছিলাম আমি। পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল,
-"একটি ঘাটের আত্মজীবনী! পরীক্ষায় তোকে এই রচনাটা লিখতে দেবে বুঝি মৌপ্রিয়াদি?"
ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম বিট্টু। ও তরফের কাকার ছেলে। ভারি পাজি। বাড়িতে মা-জ্যেঠির নজর এড়িয়ে শুধু আমার পিছনে লাগে। আমি ওকে চোখ পাকিয়ে বললাম,
-"তোর সবসময় ফাজলামো, তাই না রে? দাঁড়া মেজকাকিমাকে বলে তোকে মার না খাইয়েছি আমি!"
-"সে সব পরে হবে। এখন চল তো, ওইদিকের জঙ্গল থেকে ঘুরে আসি। সবাই দাঁড়িয়ে আছে তোর জন্য।"
জঙ্গল আমার একদম ভালো লাগে না। বড় বড় গাছের ফাঁক গলে সূর্যের যে টুকু আলো ভিতরে ঢোকে, তাতে আলোর চেয়ে অন্ধকার হয় বেশি। মনে হয়, একটা ময়লা তেলচিটে চাদর যেন চাঁদোয়া হিসেবে টাঙিয়ে রেখে দিয়েছে কেউ। কিন্তু এখন আপত্তি জানাবার আগেই বিট্টু আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল সেখানে।
যা ভেবেছিলাম তাই! এই জঙ্গলে মানুষ ঢোকে না একেবারেই। পথ চলতে গিয়ে মাকড়সার জাল চোখে মুখে জড়াচ্ছে। জুতোর চাপে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় মড়মড় শব্দ উঠছে। আমি যেন অনুভব করলাম, পাতার ওই মর্মর ধ্বনির মধ্যে মিশে আছে কারো আর্তনাদ! আশ্চর্য, ওরা কেউ শুনতে পাচ্ছে না! এই ভর দুপুরে এতজনের মাঝে থেকেও আমার গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল।
-"কি সুন্দর জঙ্গল! অথচ কাল বিকেলে এখানে একটু আসতেই রাখহরি দাদু কেমন করে উঠল!"
ব্যাজার মুখে বলল হিয়া, আমার জ্যাঠতুতো বোন। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই তাড়াতাড়ি করে বলে উঠল,
-"আরে তুই তখন ঘরে কি করছিলি! আমরাই এই কয়জন মিলে একটু ঘুরতে বেরিয়ে ছিলাম। দাদু এমন করল যে, সব ফেলে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়লাম!"
আমি আর কিছু বললাম না। ওরা আরো এগিয়ে গেল। একটা বউ কথা কও পাখি অনেকক্ষণ থেকে ডাকছিল। কোথা থেকে যে ডাকছিল সেটা ধরতে পারছিলাম না। একটা ছবি তুলতাম। গুগল ছাড়া এইসব পাখির দেখা পাওয়াও তো ভাগ্যের ব্যাপার!
-"এই চল চল, এবার বেরো, আর ভিতরে ঢুকতে হবে না। এবারে রাস্তা হারিয়ে ফেলব।"
-"কেন আর একটু থাকি না! আর এটা কি আমাজনের জঙ্গল নাকি যে রাস্তা হারিয়ে ফেলবি!"
এই প্রথম নিজের থেকে কিছু বললাম আমি। তিউ আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বলল,
-"যাদবপুরে থাকা মানুষদের কাছে বিলাসগড় আর আমাজনের জঙ্গলের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই বুঝলি?"
-"হ্যাঁ হ্যাঁ হয়েছে, হয়েছে! জ্ঞানপাপী সব।", অপুদাদা একপ্রকার খেঁকিয়েই বলে উঠল, "চল তো চল, খিদেয় পেট চুঁই চুঁই করছে, আর মশার কামড় খেতে পারি না।"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমরা বেরিয়ে এলাম। তবে ঠিক করলাম, আরো একবার যাব আমি এই জঙ্গলে। ওখানে আমি কিছু দেখতে পেয়েছি, বউ কথা কও পাখির থেকেও বেশি কিছু!
বাড়ির দিকে ফিরে দেখি, সেখানে আরেক হুলুস্থুল কান্ড। মা-বাবা, কাকা-জ্যাঠা, জ্যেঠিমারা সব দেউরির কাছে জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে কি সব বলে যাচ্ছে। দূর থেকে শুনলে মনে হবে, লোকাল ট্রেনের কামরায় উঠে পড়েছি। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেও আর এক জ্বালা। সবাই একসাথে সবকিছু বোঝাতে চায়। ফলে কারো কথাই বুঝে উঠতে পারি না।
সমস্যার সমাধান করল আমাদের ছোট ভাই পিকলু। কাছেই রাখা একটা ছোট্ট টুলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
-"সাইলেন্স, সাইলেন্স! এভ্রিবডি কীপ কোয়ায়েট!", মৃদু গুঞ্জন থেমে গিয়ে সবাই পিকলুর দিকে তাকাল। সবার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে পিকলু বলল,
-"যে কোনো একজন বলো, সবাই মিলে কথা বললে কিছু বোঝা যায়! জানো না, যখন একজন কথা বলে তখন চুপ করে থাকতে হয়!"
বড্ড পাকা পাকা কথা শিখেছে ছেলেটা! আমরা সবাই ওর কথায় হেসে উঠলাম। তারপর জ্যেঠিমা বলল,
-"আরে দেখ না, আজ রাখহরি কাকাকে বললাম, এই এত বড় বাড়ি, কোথাও একটু লেবু লঙ্কা টাঙানো নেই! নজর-টজর লেগে যায় যদি! কিন্তু সেই এক লেবু-লঙ্কা লাগাতে গিয়ে সবার গলদঘর্ম অবস্থা। সুতোয় ঠিক করে ফাঁসই লাগাতে পারছে না। খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে!"
-"খুলেই যখন যাচ্ছে, তখন আর টাঙানোর কি দরকার!" জ্যেঠু চিড়বিড়িয়ে বলে উঠল। ব্যর্থতা মনে হয় জ্যেঠুরই। অপুদাদা এগিয়ে এসে বলল,
-"এর জন্য এত কথা! দাও, কোথায় তোমাদের লেবু-লঙ্কা! আমিই লাগিয়ে দিই।"
প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার অপুদাদারও লেবু-লঙ্কা ঝোলানোর জন্য টুলের দরকার পড়ল। এইবারে কাজ হয়ে যাবে ভেবে আমরা সবাই ভিতর বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু তখনও জানতাম না, আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে!
#পর্ব-তিন
বড় অন্ধকার এই জায়গাটা। চারপাশে কিচ্ছু ঠাহর হয় না। গত দুদিন ধরে সে বসে রয়েছে এখানে। বেরোবার অনেক চেষ্টা সে করেছে কিন্তু একটা বিশাল বড় মিশমিশে রঙের পেঁচা তার জ্বলন্ত দুই চোখ নিয়ে পাহারা দিচ্ছে তাকে। একটু নড়াচড়া করলেই ডানা ঝটপটিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
ছোটবেলায় মা-ঠাকুমার মুখে শুনেছিল, পেঁচা দিনে ঘুমোয় আর রাতে জাগে। কিন্তু গত দুইদিনে এই পেঁচাটাকে সে ঘুমোতে দেখেনি। অতন্দ্র প্রহরীর মত পাহারা দিয়ে রেখেছে তাকে। তার আশেপাশে একটু একটু করে জমা হচ্ছে ঝুরো ঝুরো মাটি।
উপরে যে কি অবস্থা হয়েছে তা দেখতে বড় সাধ হয় তার। রায়চৌধুরীদের বাড়িতে ভাঙনটা ঠিক কীভাবে ধরেছে, তা দেখতে না পারলে চক্ষু সার্থক হবে না তার। তাকে অলক্ষ্মী আখ্যা দেওয়া? তাকে বাড়ি থেকে দূর করে আলাদা কুঁড়েতে রাখা! কেন, তার কী দোষ?
সে বাড়িতে বউ হয়ে আসার সাথে সাথে যদি দীর্ঘদিন অসুখে ভোগা ছোটগিন্নী মরে যায়, তাতে তার তো কোনো হাত নেই! সে তো নিজে থেকে আসেনি এ বাড়িতে! বড় কত্তা নিজের দয়া দেখানোর জন্য, গরীব বামুনের মেয়েটাকে উদ্ধার করার জন্য হাঁটুর বয়সী এই মেয়েটাকে বিয়ে করেছেন। ভেবেছেন, এক কোণে ফেলে রাখলেও সে কিচ্ছুটি বলবে না!
এই কয়েক বছরের জীবনে এতবার অলক্ষ্মী বদনাম দেওয়া হয়েছে তাকে যে, বীতশ্রদ্ধ হয়ে সে বদ্ধপরিকর হয়েছে এই বাড়িতে অলক্ষ্মীকে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য। কুমোর পাড়ার ধার ঘেঁষে ঘর ছিল তাদের। ছোট থেকে তাদের দেখে দেখে মাটির পাত্র, মূর্তি বানাতে সিদ্ধহস্ত সে।
রাতের বেলা সকলের চোখের আড়ালে ভাঙা মন্দিরের পিছনে গিয়ে সেই বিদ্যাই এতদিন ধরে কাজে লাগিয়েছে সে। কাজ শেষ হতেই তাকে প্রতিষ্ঠা করেছে মা লক্ষ্মীর মন্দিরে, তার স্থানে। কিন্তু নিজেও যে সে এভাবে আটকা পড়ে যাবে, এ যে তার দুঃস্বপ্নের অতীত। কবে মুক্তি পাবে সে এখান থেকে? কবে রায়চৌধুরী বংশকে শেষ হতে দেখে চক্ষু জুড়োবে তার?
************************
-"তোর জন্য, সব তোরই জন্য হল দাদা! পিকলুকে নিয়ে আমি এখানে আসতে চাইনি। এখন এই গ্রাম দেশে ছেলেটার আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমি কিন্তু কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না!"
চিৎকার করে নিজের দাদাকে কথাগুলো বলল আমাদের সবার ছোটকাকা, পিকলুর বাবা। দুইদিন ধরে পিকলুর জ্বর। অত ছটফটে ছেলেটা কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। সকলে পালা করে পিকলুর খেয়াল রাখছে। সাথে আনা ওষুধ খাওয়াচ্ছে কাকিমা ওকে, কিন্তু ফল কিছুই হচ্ছে না। বাড়ির আনন্দের পরিবেশ বদলে গিয়ে থমথম করছে।
গাড়ি করে পিকলুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলেছিল সবাই কিন্তু সদর হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন, এই অসুস্থ অবস্থায় এতটা ধকল পিকলুর ছোট্ট শরীর নিতে পারবে না। চিন্তা করতে করতে কাকা অসহায় হয়ে পড়েছে, আমরা বুঝতে পারছি।
কাকার চিৎকার শুনে কাকিমা পিকলুর কাছ থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে এসে বলল,
-"আর কতবার বললে তুমি বুঝবে, এটা ভাইরাল জ্বর, তিনদিনের আগে সারবে না! এর আগেও তো এমন হয়েছে ওর। কেন তুমি খামোখা অন্যদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছ?"
-"আর যদি না সারে?"
কাকার মুখটা কেমন অসহায়ের মত দেখালো। কাকিমা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"এখানে ওর কাছে তো আমরা সবাই আছি। ওইদিকে অপুটা যে একা একা বিছানায় পড়ে রয়েছে! তোরা ভাই-বোনেরা গিয়ে ওর কাছে বোস!"
সেদিন লেবু লঙ্কা সম্বলিত সুতোটা ঝোলাতে গিয়ে অপুদাদা ওই নীচু টুল থেকে পড়ে গিয়ে পা মচকে বসল। খুব মারাত্মকভাবে পা-টা মচকেছে দাদার, ফুলে একেবারে ঢোল হয়ে আছে। যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে বলেছিল,
-"কে আমায় ঠেললি রে?"
আমরা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। দাদা টুলে ওঠার পর আমরা সবাই তো ভিতরে যাচ্ছিলাম, দাদার কাছে তো কেউ ছিলই না! অথচ দাদা জোর দিয়ে বলল,
-"বললেই হবে! আমি স্পষ্ট ফীল করলাম, কে আমার পিঠে জোরে ধাক্কা দিল!"
সেই অপুদাদাও পায়ে চুন হলুদ লাগিয়ে বিছানায় বসে আছে। ফোলাটা একটু কমেছে বটে, কিন্তু যন্ত্রণাটা একই আছে। আমরা ও ঘরে যেতেই ম্লান হাসল দাদা। কি থেকে যে কি হয়ে গেল!
সেদিন যখন দাদা পড়ে যাওয়ার পর আমরা সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, রাখহরি দাদু তখন ভয়ার্ত কন্ঠে বলেছিল,
-"সে চায় না, সে চায় না, এই বাড়িতে মঙ্গলময় কিছু হোক! এখনও এই বাড়িতেই ফিরে এসেছে সে। মূর্তি বিদায় করলেই কি আর অলক্ষ্মীকে বিদায় করা যায়! সব শেষ করে দেবে ও। সব শেষ করে দেবে! কিন্তু কে নিয়ে এলো ওকে? কে নিয়ে এলো?"
রাখহরি দাদুকে বিড়বিড় করতে দেখে মেজ কাকিমা বিরক্ত হয়ে বলে উঠেছিল,
-"এখানে দাঁড়িয়ে কি বিড়বিড় করছ কাকা? যাও না, একটু বরফ নিয়ে এসো না! দেখছ, ছেলেটা ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে! এই কী, তোমার গল্প বানানোর সময়?"
দাদু চলে গিয়েছিল। লেবু লঙ্কাও আর লাগানো হয়নি। আকাশ ফুটো করে বৃষ্টি নেমেছিল সেদিন। বৃষ্টির তোড়ে সাদা হয়ে গিয়েছিল চারপাশ। সাথে ঝোড়ো হাওয়া সোঁ সোঁ করে বইছিল।
যতই উন্নত হয়ে যাক না কেন, ঝড় বৃষ্টিতেও বিদ্যুৎ পরিষেবা অক্ষত থাকবে, এমন উন্নতও হয়ে যায়নি বিলাসগড়। বড় বড় কয়েকটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারছিলাম আমরা। মোবাইলের চার্জ বাঁচানোর জন্য মুড়ি আর আলুর চপ সহযোগে নির্ভেজাল আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম অনেকদিন পর।
তখনও পিকলু সুস্থই ছিল। ওর মায়ের সাথেই আছে ভেবে আমরাও ওকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামাইনি। কিন্তু হঠাৎ একটা অস্পষ্ট আর্তনাদে আড্ডার তাল কেটে গিয়েছিল। আর তখনই আমরা সবাই দেখেছিলাম, খড়খড়ি দিয়ে ঢাকা বারান্দা থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে নীচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ও কে? পিকলু?
খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল তিউ। এক লাফে পিকলুর কাছে গিয়ে ওকে টেনে নামিয়ে এনেছিল। বৃষ্টির ছাঁটে সারা শরীর ভিজে গিয়েছিল ওর। আমাদের দিকে তাকিয়ে ও বলেছিল,
-"একটা বউ এসেছিল জানো! ওই বউটা একটা ঠাকুরের মূর্তি এইখানে নামিয়ে রেখে আবার চলে গেল!"
উফ, রাখহরি দাদু মূর্তি মূর্তি করে সবার এমন মাথা খেয়েছে, এই বাচ্চাটাও সেই ব্রেন ওয়াশ থেকে বাদ যায়নি! আমি আর তিউ কোমর সমান রেলিং থেকে ঝুঁকে নীচে তাকালাম, আর তখনই আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত গাছের ডালপালার মত চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল।
সেই আলোয় আমি আবার দেখলাম, সদর দোরে দাঁড় করানো রয়েছে সেই কালো কুচকুচে মূর্তি, যাকে নাকি আজ সকালেই জঙ্গলের ওদিকে রেখে আসা হয়েছিল। রাখহরি দাদু বলেছিল, ওইখানেই থাকে এটা। কিন্তু ওই জঙ্গল থেকে কে নিয়ে আসছে এটাকে? কি আছে ওই জঙ্গলে?
আমি যে সেদিন নোংরা, ভাঙা, হাড় কঙ্কাল বের করা মন্দিরের এক আদল দেখলাম, ওটা কীসের মন্দির? ওখানে কি কেউ থাকে? কেউ থাকতে পারে অমন পরিবেশে!
-"তুই ওই জঙ্গলে ঢুকেছিলি? কেন গিয়েছিলি? জানিস না ওখানে যাওয়া বারণ?"
দুদিন পরে সকালবেলা ওই জঙ্গল থেকে ফিরেই সবার প্রশ্নবাণের সামনে পড়তে হল আমায়। পিকলুর জ্বর একেবারে সেরে গেছে। কাকিমার কথাই সত্যি হয়েছে। ছোটকাকাকে দেখলাম, কেমন অপরাধীর মত মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! দাদার পা-ও অনেকটা ভালো হয়ে গিয়েছে। বাড়ির পরিবেশ ভালো দেখেই আমি ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়েছিলাম।
আসলে আমি ওদের বলতে পারছি না, ওই জঙ্গল আমায় টানছে! মনে হচ্ছে, এই মূর্তির সাথে জড়িয়ে আছে অনেক পুরোনো কথা! মূর্তি ফিরে ফিরে আসছে সেই ইতিহাসের টানে। কেউ চাইছে, আবার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হোক। কেউ চায় না, আমরা এখানে থাকি, আমরা ভালো থাকি! এই রায়চৌধুরী বংশের শেষ হয়ে যাওয়াটাই তার কাম্য। কিন্তু কেন?
আগামীকাল ঠাকুমার বাৎসরিক কাজ। পিসিরা সবাই আজকের মধ্যেই এসে যাবে। শেষ মূহুর্তের গোছগাছ চলছে। সবাই ব্যস্ত। ভেবেছিলাম, কেউ তেমন খেয়াল করবে না। কিন্তু ধরা পড়ে গেলাম তাও। আমি আমতা আমতা করে বললাম,
-"না এমনিই একটু ঘুরে দেখতে গেছিলাম আর কী! কোনো নাম না জানা পাখি বা বুনো লতার ফুল যদি পাই!"
-"এখানে সবাই আমরা খেটে খেটে মরছি, আর তুই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস! ভালো!"
তিউয়ের কথা খুব গায়ে লাগল আমার। সবসময় আমাকে এরকম করেই কথা বলে ও। শুধু ও কেন? বাড়ির সবাই বলে। আমি নাকি লক্ষ্মীছাড়া। আমি কি করে বলব, এসব সংসারের কচকচানি, হিসেব নিকেশ যে আমায় টানে না। ওদের চোখে যা কিছু অদ্ভুত তাই যে বরাবর চুম্বকের মত টানে আমায়।
ওদের কথায় খুব রাগ হল আমার। দুরদার করে পা ফেলে উঠে গেলাম আমি ওপরে। বলব না, আজ আমি কি রহস্যময় জিনিস দেখে এসেছি তা কিছুতেই ভাগ করে নেব না ওদের সাথে।
#পর্ব-চার
-"সময়টা তখন কার্তিকের মাঝামাঝি। গরমটা যাই যাই করেও দুপুরের দিকে থেকে যাচ্ছিল। ভরদুপুরে আচমকা বাইরে বেরোলে কপালে, পিঠে বিনবিনে ঘাম জামার উপর দিয়ে ফুটে ওঠে। কিন্তু সূর্য পশ্চিম দিকে পাড়ি দেওয়ার সাথে সাথেই হিমের একটা আলগা চাদর প্রকৃতি মাথার উপর বিছিয়ে দিত। রাত বাড়ার সাথে সাথে গাঢ় হত সেই চাদর। ভোরের দিকে গায়ে দেওয়ার জন্য একটা মোটা চাদর বা পাতলা কাঁথার প্রয়োজন পড়ত।
সেই সময়েই ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনা। তোমাদের দুই ঠাকুরদার মধ্যে বিরোধ বাঁধল। তাও যে সে বিরোধ নয়, সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে বিরোধ। সকাল থেকে দুই ভাইয়ের গগনবিদারী চিৎকারে বাড়িতে কাক চিল তিষ্ঠোতে পারছে না। বড়গিন্নীমা মানে তোমাদের বড়ঠাকুমা দুজনকে থামানোর বৃথা চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছেন। বিলাসগড়ের সকলে অবাক হয়ে গেল....."
সকাল সকাল রাখহরি দাদুকে পাকড়াও করে গল্প শুনতে বসেছি আমরা। নাহ, ঠিক গল্প নয়, গল্প হলেও সব সত্যি ঘটনা। আমাদের বাবা, কাকা, জ্যেঠুরা তখন অনেক ছোট, দাদুর তখন জোয়ান বয়স। সেই সময়ের রায়চৌধুরী বংশের ইতিহাস শুনছি আমরা। যাক, বেশি কথা বলে সময় আর আগ্রহ দুটোর একটাও নষ্ট করে লাভ নেই। আমরা বরং গল্পে.... ইতিহাসে ফিরি।
-"রাম লক্ষণের মত দুই ভাইয়ের এমন বিরোধ আগে কেউ কখনো দেখেনি। বেলা গড়িয়ে যায়, তবু বাক বিতণ্ডা আর থামে না। মা লক্ষ্মীর মন্দিরের কুল পুরোহিত দরকারি কথা বলতে এসে থমকে গিয়েছেন। অসহায় হয়ে একবার তোমাদের বড়দাদুর দিকে আর একবার তোমাদের ছোটদাদুর মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। এমন সময় তোমাদের বড়ঠাকুমা এসে কপাটের আড়াল থেকে বললেন,
-'আপনি বরং আগে পুজোটা সেরে নিন ঠাকুরমশায়! তারপর না হয় এসে কথা কইবেন! আশা করি ততক্ষণে এসব.....। নইলে আপনারই বিলম্ব হয়ে যাবে!'
তোমাদের ঠাকুমার কথা শুনে তিনি চলে গেলেন। ঠাকুরমন্দির তখন নদীর পাশে পুব দিকে ছিল। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আবার ফিরে এলেন। তাঁর চোখে জল, দৃষ্টি উদভ্রান্ত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি সকলকে বারবার করে মন্দিরে যেতে বললেন।
এত বছর ধরে মায়ের সেবা করে আসছেন তিনি, তাঁর এমন চেহারা কেউ কখনো দেখেনি! অবাক হয়ে সকলেই তাঁর পিছন পিছন ঠাকুর মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। আর গিয়ে কী দেখলেন জানো? মা লক্ষ্মীর বেদীর উপরে তিনি নেই! তার বদলে অবস্থান করছেন কুরূপা অলক্ষ্মী। যার মূর্তি তোমরা বাড়িতে আসার পর পর আবার দেখতে পেলাম।"
-"কিন্তু অলক্ষ্মী বাড়িতে থাকলে কি হয় দাদু? তুমি ওই মূর্তিটা দেখলে বা ওর কথা শুনলেও এত ভয় পেয়ে যাও কেন?"
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন না করে পারলাম না। গল্পে বাধা পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই সবাই ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল। তিউকে দেখে মনে হচ্ছিল, সত্যযুগ হলে ও ঠিক আমায় দৃষ্টি দিয়েই ভস্ম করে দিত। কিন্তু আমি এসবে পাত্তা দিলাম না। কারণ কোনো জিনিস শুনে বা দেখে মনে সন্দেহ, প্রশ্ন জাগলে সেটাকে সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে ফেলাই উচিত। পরে জিজ্ঞেস করব বলে জিইয়ে রাখতে গেলে অনেক প্রশ্নের ভিড়ে তা হারিয়ে যেতে পারে!
রাখহরি দাদু কিন্তু ওদের মত বিরক্ত হল না। বরং ধৈর্য ধরে গুছিয়ে বলল,
-"কি বলছ দিদিভাই, ভয় পাব না? অলক্ষ্মী যে সংসারে অশান্তি ডেকে আনে, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব লাগায়, রোগ-ব্যধি বহন করে আনে। যে সংসারে অলক্ষ্মী ঢোকে সে সংসারের ভাঙন যে আটকানো যায় না! লক্ষ্মী সেখানে তিষ্ঠোতে পারেন না!"
-"এখন এসব কথা থাক না! এসব পরেও তো উইকিপিডিয়া থেকে জেনে নিতে পারবি! এখন শোন না, কেন আমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম কলকাতায়? তুমি বলো তো দাদু!"
আমায় থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল দাদা। পা ঠিক হয়ে গিয়ে আগের মেজাজে ফিরে এসেছে সে। দাদু আবার বলতে শুরু করল,
-"মন্দিরে ওঠবার সিঁড়িতেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন তিনি। অঝোর নয়নে কাঁদতে কাঁদতে তিনি শুধুই কপাল চাপড়ান আর বলেন, 'এ কী হল! এ কী সব্বোনাশ হল! কে এমন করল?' তোমাদের দাদুরা, ঠাকুমা যতই জিজ্ঞেস করেন, 'কি হয়েছে?' তিনি কিছুই বলেন না! শেষে তোমার দাদু এক ধমক লাগাতে বলেন, বাড়িতে অলক্ষ্মী ঢুকেছে। সব শেষ না করে সে যাবে না।
বলাই বাহুল্য, তোমাদের দুই দাদু এই কথা একপ্রকার উড়িয়েই দিলেন। বললেন, ভাঙা মন্দিরের পিছনে তাকে বসিয়ে দিয়ে আসতে। কিন্তু অলক্ষ্মী যে তার স্থান একজনকে দিয়ে দিয়েছেন। আবার কি সেই স্থানে তিনি ফিরে যেতে পারেন? পারেন না!
তোমাদের ঠাকুমা রাগ করে গাল পেড়ে বললেন, 'এ ওই হতচ্ছাড়ী অলক্ষ্মী মেয়েমানুষটারই কাজ! প্রথমদিনেই ওর দিষ্টি আমার একটুও ভালো লাগেনি! নিয়ে এসো তাকে। চুলের মুঠি ধরে নাড়লেই সব স্বীকার যাবে সে!'
কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না। কপ্পুরের মত সে যেন উবে গেল এই রায়চৌধুরী বাড়ি থেকে। সেদিন থেকে অলক্ষ্মী এই বাড়িতেই অধিষ্ঠান করতে লাগলেন। মূর্তিকে ওইখানে ফিরিয়ে দিয়ে এলে কি হবে, বাড়িতে লক্ষ্মীকে আর ফিরিয়ে আনা গেল না। দায়রা কোর্টে মামলা লড়লেন কতদিন দুই ভাই! তোমাদের এক বিবাহযোগ্যা পিসি, যার কিনা বিয়ের সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল, দুম করে তার বর মরে গেল!
শোকে দুঃখে উন্মাদিনী হয়ে গেল সে। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াত! দুপুর রোদে ঘাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে থাকত। তারপর একদিন জলে ডুবে মরে গেল। সাঁতরে নদী এপার-ওপার করা মেয়েটা জলে ডুবে মরল কীভাবে, কেউ বুঝতে পারল না! দুদিন নিঁখোজ থাকার পর নদীতে জাল ফেলে তোলা হয়েছিল তার দেহ।
তারপরেই তোমাদের ঠাকুমা এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। কিছুতেই আর এখানে তাকে রাখা গেল না। তাঁর তাড়নাতেই তোমাদের দুই দাদু বেশ কিছুটা জমি বেচে কলকাতায় বাড়ি কিনলেন। গত বছরে তোমার ঠাকুমার মৃত্যুশয্যায় গিয়ে দেখলাম, রাম লক্ষণের ন্যায় দুই ভাই পৃথগান্নই রয়ে গেছেন। অলক্ষ্মীর অভিশাপ সেখানেও কার্যকর রয়ে গিয়েছে!"
দাদু বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বুঝতে পারছি, অতীতের স্মৃতি রোমন্থনে তার মন ভারী হয়ে উঠেছে। আমরাও চুপ করে বসে রইলাম। অত ছোট পিকলু পর্যন্ত একটা কথাও বলল না। সকলের মনেই একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল বোধ হয়, এই এত কিছু না হলে, ঐ অলক্ষ্মীর মূর্তি এই বাড়িতে প্রতিষ্ঠা না পেলে আমরা একই বাড়িতে আলাদা থাকতাম না। আমাদের জীবনটাই হয়ত অন্যরকম হত!
-"যাই, রান্নার তদারক করি গে। কমলাকে বলে আরো কিছু শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। অতটা পথ যাবে সব কাল!"
রাখহরি দাদু উঠে চলে গেল। কিন্তু আমার মনে জমা হল একরাশ প্রশ্ন! এর উত্তর একমাত্র দাদুই দিতে পারে।
ঠাকুমার কাজ খুব ভালোভাবেই মিটে গিয়েছে। সব বাধা কেটে যাওয়াতে সবাই একপ্রকার নিশ্চিন্তই হয়েছে। কিন্তু এখানে আর থাকা হবে না। ছোটকাকা ফিরতে চাইছে। পিকলুকে ডাক্তার দেখাতেই হবে। দাদার পা-টাও মাঝে মাঝে জ্বালাচ্ছে। এসবের জন্যেই এখানে আর কেউ থাকতে চাইছে না। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর?
আমি জানি, কে বারবার ওই অলক্ষ্মীর মূর্তি এইখানে এনে রাখছিল! কিন্তু কেন? শুধুমাত্র আমায় সকলের কাছে খারাপ করবার জন্যে? এত ঘৃণা তুই আমায় করিস তুই? আমার উপর রাগ মেটাতে গিয়ে ছোট ভাইটা আর দাদাটাকে কষ্ট দিলি?
সেদিন আমি ক্যামেরা নিয়ে একা একাই জঙ্গলের ভিতরে ঢুকেছিলাম। একটা অমোঘ আকর্ষণ আমায় টানছিল। আশ্চর্য, সেদিন আমার একটুও ভয় করেনি!
শুকনো পাতায় মর্মর ধ্বনি তুলে আমি এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম একটা ভাঙা ঘরের সামনে। কোনো একসময় সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো ঘরটা আজ একদিকে হেলে গিয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে প্রায়। আশ্চর্য, এত বড় বাড়ির সীমানায় এমন ভাঙা ঘর? এটা কীসের জন্য ব্যবহার হত?
দরজা একটা ছিল হয়ত কোনো সময়ে কিন্তু এখন তার কোনো অস্তিত্ব নেই আর। কাছেই একটা আমগাছের বিরাট ডাল তার পুরোটা ভার ছেড়ে দিয়েছে ঘরের মাথায়। একটা কাঠবিড়ালী এদিক-ওদিক তাকিয়ে ত্রস্ত পায়ে আবার কোথায় এগিয়ে গেল!
আমি আরো দুই পা এগিয়ে গিয়েছিলাম ঘরটার দিকে, আরো ভালো করে দেখবার জন্য। বারবার মনে হচ্ছিল, এখানে আমি আগেও এসেছি। এই ঘর, এই চারপাশ আমার খুব পরিচিত। আমি জানি, আমাদের প্রত্যেকের জীবনে একবার না একবার এরকম অনুভূতি হয়! হঠাৎ হঠাৎ একটা চিত্রপট স্লাইডের মত সরে যায় মস্তিষ্ক থেকে। মনে হয়, এই পরিবেশে, এই পরিস্থিতিতে আমি আগেও আরো একবার বেঁচে নিয়েছিলাম! দেজা-ভু!
তখনও সেই একই অনুভূতি হচ্ছিল আমার। একটা দমচাপা কষ্ট হচ্ছিল বুকের মধ্যে। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে গিয়েছিলাম ওখান থেকে। আর তখনি শুকনো পাতার মধ্যে দেখেছিলাম সেই জিনিসটাকে! একটা কানের দুল! পাতার ফাঁক গলে রোদ তার উপর পড়ে ঝিকিয়ে উঠছে সেটা। জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব।
এই কানের দুল আমার খুব চেনা। আমিই তো কিনে দিয়েছিলাম! তার মানে আমার আগেও এই গভীর জঙ্গলে তিউ এসেছিল। কিন্তু কেন? আমার মত ওকেও কি এই জঙ্গল, এই ভেঙে পড়া ঘর টানছিল? কই আমায় কিছু বলল না তো?
কিন্তু তখনও আরো কিছু জানা বাকি ছিল আমার! আরো ভয়ঙ্কর কিছু। যেটা জানার পর আমার চেনা মানুষটার পাল্টে যাওয়া চেহারাটা আমার সবকিছু ওলোট পালোট করে দিয়েছিল। সবকিছু?
#পর্ব-পাঁচ
-"এসব কি বলছিস তুই? আমি এসব করিনি, বিশ্বাস কর পিউ! আমি এসবের কিছুই জানি না!"
-"জানিস না! তুই কিছুই জানিস না? তাহলে এই কানের দুলটা, তোর জামার টুকরো ওসব জায়গায় গেল কি করে তিউ?"
জঙ্গল থেকে ফিরে এসে আমি তিউকে সরাসরিই আক্রমণ করি। ভেঙে পড়া কুঁড়ে ঘরের সামনে থেকে তিউয়ের কানের দুলটা কুড়িয়ে পাওয়ার পর অমোঘ এক আকর্ষণের মতই আমি চলে গিয়েছিলাম আরো গভীর জঙ্গলে। এইখানটা আরো দুর্ভেদ্য! গাছগুলো আরো ঘন। একে অপরের সাথে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। দিনের বেলাতেও ঝিঁঝি ডাকে এখানে।
সেই অমোঘ টানকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা হারিয়ে ছিলাম আমি। গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল কঙ্কাল হয়ে যাওয়া আরো একটি ভগ্নস্তুপের সামনে। এর আকৃতি দেখলে মন্দির বলেই মনে হয় একে। কোনো প্রাগৈতিহাসিক কালে হয়ত এই মন্দিরেই অধিষ্ঠান করতেন জাগ্রত দেবতা। রোজ ফলমূল ও বিবিধ উপাচারসহ আরাধনা করা হত দেবতার। শঙ্খ, ঘন্টা, উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে থাকা এই স্থানটায় এখন বিরাজ করছে অপার নিস্তব্ধতা।
দেওয়াল ফাটিয়ে সেখানে শিকড় বিস্তর করেছে বটের চারা। প্রকৃতির নিয়মে কোনো স্থানই শূণ্য থাকে না। কেউ না কেউ এসে সে স্থান দখল করবেই। একদা যে স্থানে অধিষ্ঠিত ছিল কোনো দেবতা, আজ সেখানেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে মহীরূহ।
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা সম্ভবত মন্দিরের পশ্চাৎভাগ। স্তুপ হয়ে পড়ে থাকা পাতা, গাছের মরা ডাল সরিয়ে ঘুরে সামনের দিকে গেলাম আমি। এই তো দরজার মত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে! কিন্তু উপরে ওঠার সিঁড়িটা এমনই ভগ্ন দশায় ছিল যে, তার উপর আর উঠতে সাহস পাইনি আমি।
সামনে থেকে ঘুরে গিয়ে অন্য পাশটায় গিয়েছিলাম আমি। আর সেখানে গিয়ে চমকে উঠে ছিটকে উঠেছিলাম। ভাঙা মন্দিরের সে পাশটাতে রয়েছে সদ্য খোঁড়া এক মানুষ সমান এক গর্ত! অনেকদিন ধরে যেন এখানে কেউ ছিল! সম্প্রতি সে উঠে এসেছে! এই কাছেপিঠেই হয়ত আছে সে! আমাকে দেখছে! আমার প্রতিটা পদক্ষেপ লক্ষ্য করে নজরবন্দি করে রাখছে সে আমায়!
সারা শরীরটা কেমন ভারশূণ্য হয়ে গিয়েছিল আমার! মনে হচ্ছিল, খুব কাছে, অনেক কাছে কেউ আছে! ঐ গাছটার আড়াল থেকে কেউ কি বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়াবে আমার? কে দাঁড়াবে? যে এতদিন এই গর্তটায় লুকিয়ে ছিল? কিন্তু কোনো মানুষ কি গর্তের মধ্যে অক্সিজেন ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে?
কপালে বিনবিনে ঘাম জমছিল আমার। পায়ে পায়ে পিছনে সরতে গিয়ে একটা পাথরে ধাক্কা লেগে পড়ে যেতেই মুখ থেকে কান্না মেশানো একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল আমার। আমি ভেবেছিলাম, কেউ আমায় ফেলে দিয়েছে ধাক্কা দিয়ে! আর তখনই দেখেছিলাম আমি সেটা। কুর্তির কাপড়! এই কুর্তিটা এই বছর পুজোয় বাবা আমাদের দুজনকে কিনে দিয়েছিল। তিউ ফর্সা বলে ওর জন্য কালো রঙ আর আমি শ্যামলা বলে আমারটা হলুদ!
আর আমার হাতে ধরা কাপড়টার রঙ ছিল কালো! ঘোর কৃষ্ণবর্ণ! ঠিক যেন ঐ মূর্তিটার মত!
দিনের আলো যেন কমে আসছিল দ্রুত। সূর্যের যেন অস্ত যাওয়ার জন্য বড্ড তাড়া লেগেছিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করেছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, ওই সে আমায় ধরে ফেলল! আমি চলে এলাম তার নাগালের মধ্যে!
কিন্তু না! আমি ধরা পড়িনি। ওখান থেকে এসেই তিউকে প্রশ্ন করেছিলাম আমি। কিন্তু তিউ এমনভাবে বলল যেন কিছুই জানে না ও! আমি বিশ্বাস করিনি ওর কথা। কিন্তু যখন ও ওর সেই একজোড়া দুল আর অক্ষত কুর্তিটা দেখালো আমি তখন স্তব্ধ হয়ে বসে পড়লাম বিছানায়। কারণ ওর তো কোনো দুল হারায়নি, জামাও ছেঁড়েনি!
এরপর ঠাকুমার বাৎসরিকের কাজ খুব ভালোভাবেই মিটে গেল। দাদু যে ওই মূর্তিটা কোথায় রেখে এসেছে তা আর জানতে চাইনি আমরা কেউই। আগামীকাল ধনতেরাস। আর কালকেই আমরা ফিরে যাব।
এর মধ্যেই একসময় আবার রাখহরি দাদুকে চেপে ধরলাম আমরা। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-"আচ্ছা দাদু, তখন গল্প বলার সময় তুমি বললে ঠাকুমা সেই দিন কাকে যেন গাল পাড়ছিলেন। কিন্তু তাকে আর এই বাড়িতে খুঁজে পাওয়া যায়নি! কে সে?"
দাদু চট করে এই কথার উত্তর দিলেন না। ঘোলাটে একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন আমার দিকে। আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। দাদু তারপর কেমন এলোমেলো স্বরে বলল,
-"তুমি জানো না, তোমার কিছু মনে নেই! আশ্চর্য!"
-"ও আবার কি জানবে দাদু! তুমি বলো না, ও যা জিজ্ঞেস করল!"
তিউ অধৈর্য হয়ে বলে উঠল। তিউয়ের স্বরে কেমন তাচ্ছিল্যের আভাস পেলাম। ও সবার সামনে না দেখালেও আজও আমায় তাচ্ছিল্য করে, করুণা করে আমি জানি। আসলে তিউ সুন্দরী, তুই পড়াশুনায় ভালো, তিউ ভালো রান্না করে, তিউ গান করতে পারে ভালো- তিউয়ের অনেক গুণ। বাড়ির সবাই এমনকি বাবা-মাও একটা সময় পর্যন্ত তিউয়েরই প্রশংসা করত। তিউয়ের তাই নিজেকে নিয়ে খুব অহঙ্কার।
যমজ বোন হলেও আমি ছিলাম তিউয়ের বীপরিত। আমি শ্যামলা, আমি অতি সাধারণ পড়াশুনায়, নিত্য নতুন রান্না করে আমি সবাইকে তাক লাগাতেও পারতাম না। একই মঞ্চে থেকেও আমি সর্বদা অন্ধকারেই ছিলাম। সমস্ত লাইম লাইট অধিকার করেছিল তিউ, আমার বোন। বাবা-মাও সকলের সামনে ওকেই মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে স্বস্তিবোধ করত।
কিন্তু একদিন পাশার দান উল্টে গেল। আমাদের আঠারো বছরের জন্মদিনে আমার আব্দারে বাবা আমায় একটা ক্যামেরা কিনে দিল। ঐ যে সেদিন দাদা বলল না, চোখে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা ছাড়া আমি আর কিছুই পারি না! ওটা একদম ঠিক কথা! যাই হোক, সেই ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবি একটা ইন্টারন্যাশানাল ম্যাগাজিনে জায়গা করে নিতেই প্রদীপের আলোয় চলে এলাম আমি। সেইদিন থেকেই তিউ আমায় ঠুকে ঠুকে কথা বলে!
আমি যদিও ওর কথায় কিছুই মনে করি না। ওর ছেলেমানুষিতে মনে মনে হাসি শুধু। এখনও ওর কথা শুনে হালকা হাসলাম আমি। আর স্পষ্ট দেখলাম, আমার হাসিটা দেখেই দাদুর শরীরটা কেমন কেঁপে উঠল। মুখের বলিরেখাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে দাদুকে আরো যেন বৃদ্ধ দেখালো। দাদু আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল।
-"সে ছিল তোমাদের বড় ঠাকুরদার দ্বিতীয় স্ত্রী। হতভাগীর নাম ছিল লক্ষ্মী। কিন্তু এই বাড়িতে আসার সাথে সাথেই অলক্ষ্মী আখ্যা দিয়ে ওই দূরের কুঁড়েতে রেখে দেওয়া হয়েছিল। লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার হাত থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য তোমাদের ঠাকুরদা তাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু হতভাগী একদিনের তরেও সংসার করতে পারেনি।"
-"কেন?"
জানি, এমন সময়ে মাঝখানে প্রশ্ন করাটা নিতান্তই বেরসিকের মত কাজ। কিন্তু নিজেকে আটকানোর আগেই প্রশ্নটা বেরিয়ে এলো মুখ থেকে। কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে দাদু বলে উঠল,
-"সে কথা আমায় জিজ্ঞেস করো না তোমরা! আমি সে কথা বলতে পারব না গো। আমায় মাপ কোরো।"
-"কেন দাদু, কি এমন কথা, যা বলা যায় না? আর তাছাড়া, সেসব কতদিনকার কথা! সেই ঘটনার সাথে যুক্ত মানুষগুলোর কেউই তো আর বেঁচে নেই!"
দাদু এতেও গলল না। মাথা নেড়ে প্রবলভাবে বলতে লাগলেন,
-"আমি পারব না গো, আমি পারব না!"
-"আচ্ছা, মারা যাওয়ার আগে ঠাকুমা তোমায় কেন ডেকে পাঠিয়েছিল দাদু? এত বছর এই বাড়ি, তোমাদের সাথে তো কোনোরকম যোগাযোগ ছিল না! তবে মৃত্যুশয্যায় ঠাকুমা তোমায় ডেকে কি বলেছিল?"
দাদার কন্ঠস্বরটা কেমন রূঢ় শোনাল। দাদু কেমন অসহায়ের মত তাকাল ওর দিকে! বয়স্ক মানুষটার ঐ দৃষ্টিটা দেখে আমার যে কী খারাপ লাগল! দাদা কেন এমনভাবে বলল? নিশ্চয় এমন কিছু কথা আছে যেটা জানাতে চায় না দাদু! কিন্তু আমরাও তো এই পরিবারের উত্তরাধিকারী, সবকিছু জানার অধিকার আছে আমাদের!
দাদু বিহ্বল হয়ে বলল,
-"আমি এসব কথা বলতেই পারি, কারো কাছে সত্যবন্দী নই আমি। তোমাদের ঠাকুমা মারা যাওয়ার আগে এই অনুমতিটুকু দেওয়ার জন্যেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন আমায়। কিন্তু আমার ভয় অন্য জায়গায় গো! সব সত্যি জানার পর তোমরা যদি সেই মানুষটাকে আর আগের মত ভালোবাসতে না পারো, শ্রদ্ধা করতে না পারো, তবে সেই মানুষটা স্বর্গে বসেও যে শান্তি পাবেন না! আমি জানি, তিনি যা করেছিলেন শুধুই নিজের কথা, নিজের সন্তানের কথা ভেবে করেছিলেন। কিন্তু সবার যুক্তি তো সমান হয় না! কেউ যদি নিজের যুক্তিবলে তাঁকে অপরাধী মনে করে, তাই তিনি কাউকে নিজের জীবদ্দশায় সে কথা জানাতে বারণ করেছিলেন!"
আমি বুঝতে পারছিলাম, সকলেই মনে মনে অধৈর্য হয়ে পড়েছে। আমারও একই অবস্থা যদিও। তবু আমি আশ্বাস দেওয়ার জন্য দাদুর হাতে হাত রেখে বললাম,
-"আমাদের এক প্রজন্ম আগের একটা মানুষের কাজের ব্যাখ্যা করব, এত বড়ও আমরা হইনি দাদু। আর মানুষ কোন পরিস্থিতিতে কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটা অপর মানুষের পক্ষে বোঝাও সম্ভব নয়। আমরা ঠাকুমার কাজের বিচারসভা বসাব না দাদু। তাঁকে আগের মতই ভালোবাসব। তুমি এবারে বলো প্লিজ!"
আমাদের জোরাজুরি হোক বা আশ্বাস, যে কোন একটা কারণেই দাদু বলতে শুরু করল।
-"লক্ষ্মীকে বিয়ে করে আনার ইচ্ছে বা পরিকল্পনা কোনোটাই তোমাদের ঠাকুরদার ছিল না। ওদের গ্রামে সেদিন কী একটা কাজে উনি গিয়েছিলেন। পণের টাকা দিতে না পারায় ছাদনাতলা থেকে বর উঠিয়ে নিয়ে গেছিল পাত্রপক্ষ। লক্ষ্মীর বাবা উপস্থিত সকলের কাছে গলায় গামছা দিয়ে হাত জোড় করে অনুরোধ করছিল, কেউ যেন ওকে বিয়ে করে উদ্ধার করে! নাহলে যে এই মেয়ে নিয়ে তাকে একঘরে হতে হবে। কিন্তু লগ্নভ্রষ্টা মেয়েকে বিয়ে করে কেউই সেদিন উদারতার পরিচয় দেখাতে আসেনি। নিতে চায়নি অমঙ্গলের দায়ও। কিন্তু লক্ষ্মীর বাপকে একঘরে করার জন্য সকলেই মুখিয়ে ছিল।
শেষে তোমাদের ঠাকুরদা সিঁথিতে সিঁদুর ঠেকিয়ে উদ্ধার করে অপমানে আধমরা হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে। কিন্তু তোমাদের ঠাকুমা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না এই ঘটনাকে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে ঘটানো ঘটনাকে নারীত্বের অপমান বলে ধরে নিলেন।
তোমাদের ছোট ঠাকুমা অনেকদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁর বুকের ওঠাপড়া দেখেই একমাত্র তাঁকে জীবিত বলে মনে হত। এছাড়া তাঁর শরীরে জীবনের কোনো চিহ্ণ ছিল না।
বড় গিন্নীমা আমায় ডেকে গোপনে কিছু ধুতরো ফুলের বীজ জোগাড় করতে বললেন। আমি তখনও কিছু বুঝিনি জানো! সেই বীজ বেটে খাইয়ে দিলেন তোমাদের ছোট ঠাকুমাকে। আধমরা মানুষটা পুরোপুরিই মরে গেল!"
দাদু থামল একটু। আমি শিউরে উঠলাম। মানসপটে ঠাকুমার মুখটা মনে পড়ে গেল। কিছুতেই আমার সাদা চুলের, স্নেহশীলা মহিলার সাথে দাদুর বলা নারী চরিত্রটিকে মেলাতে পারছিলাম না। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সত্যি সবসময় তিক্তই হয়। দাদু আবার বলতে শুরু করলেন,
-"নতুন বৌ বাড়ির চৌকাঠ পেরোবার আগেই বাড়ির এক বউ মরে গেল! সকলে তাকে অলক্ষ্মী, অপয়া আরো কত কিছু বলে গেল! এক কোণে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের জল ফেলল সে। বরণডালা সাজিয়ে তাকে বরণ করার বদলে কুলোর বাতাস দিয়ে তাকে বিদেয় করে এক কুঁড়েঘরে রাখা হল। এই বাড়িতে ঢোকার, মন্দিরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না তার। দাসীরা কাঁচা সব্জি আর অন্যান্য জিনিস তার ঘরের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়ে আসত। সেগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে রান্না করত সে। ওখানেই কাটিয়ে দিল বাকি জীবনটা।"
তারপর একদিন......"
দাদুর কথা শেষ হল না, ছোট কাকিমা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের দরজায় এসে বলল,
-"মেজদি.... মেজদি আছে রে এই ঘরে?"
মেজকাকিমা এই ঘরে কেন থাকবে? কাকিমার তো সবার সাথে রান্নাঘরে বা খাওয়ার ঘরে থাকার কথা! মানে মা-কাকিমা-জ্যেঠিমারা তো সবসময় একসাথেই থাকে!
আমাদের কথা শুনে কাকিমা হাহাকার করে বলে উঠল,
-"নেই! নেই এখানে মানুষটা? তবে কোথায় গেল? সারা বাড়িতে কোথাও তো খুঁজে পেলাম না মেজদিকে? কোথায় গেল মানুষটা?"
ছোট কাকিমা ডুকরে কেঁদে উঠল।
(ক্রমশঃ)
#পর্ব-ছয়
-"ওরে তোরা আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস রে? আমায় নিয়ে যাস না! ও আমায় ডাকছে, তোরা শুনতে পাচ্ছিস না? আমায় যে ওই গর্তটায় থাকতে হবে! ওই জায়গা তো ফাঁকা রাখা যায় না! আমায় ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও!"
মেজ কাকিমাকে খুঁজে পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থভাবে ওই প্রায় ধ্বসে পড়া মন্দিরের কাছ থেকে। সারা বাড়ির প্রতিটা কোণা খুঁজেও যখন কাকিমাকে পাওয়া গেল না, তখন সবাই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। নদীর পাড়, সম্ভাব্য সমস্ত জায়গা খোঁজার পর আমরা যখন ভগ্নোমনোরথ হয়ে গ্রামের থানায় জানাতে যাব, তখনই দাদু জঙ্গলে খোঁজার প্রস্তাব দিয়েছিল নিজে থেকেই।
বাড়িতে থাকা সমস্ত হ্যারিকেন, মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে রাতের মিশমিশে অন্ধকারে ঢুকেছিলাম আমরা। বুকের ভিতরটা কেমন ঢিপঢিপ করছিল। বিট্টু আমার পাশে পাশেই হাঁটছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে ও কান্নাটাকে আটকাতে চাইছিল।
মেজকাকিমাকে আমরা যখন খুঁজে পেলাম ও তখন কাকিমা আমার দেখা ওই গর্তের মধ্যে বসে উপর থেকে মাটিগুলো ফেলছে নিজের গায়ে। আমরা আঁতকে উঠেছিলাম আত্মহননের এমন অভিনব পন্থা দেখে। বিট্টু চিৎকার করে ছুটে যেতেই মেজ কাকিমা কেমন ঘোর লাগা গলায় বলেছিল,
-"আসিস না, আসিস না আমার কাছে! আমি অলক্ষ্মী, অপয়া! আসিস না। তোমরা সবাই কেন এসেছো এখানে, আমি ফিরে যাব না। আমি ফিরতে পারব না। ওকে এখান থেকে বের করেছি আমি। আমাকেই যে এখন শূণ্য স্থান ভরাতে হবে!"
কাউকে কাছে যেতে দিচ্ছিল না কাকিমা। মায়ের হাতে কামড়ে দিয়েছে। শেষে তিন চারজন মিলে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে কাকিমাকে। চোখে চোখে রাখা হচ্ছে, দরজা বন্ধ করে। বাইরে দরজার দিকে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থেকেছে বিট্টু। কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে ফেলেছে আমাদের হাসি খুশি ভাইটা। সবাই কত করে বললাম ওকে,
-"তুই এবার যা, একটু রেস্ট নে! আমরা তো আছি এতজন।"
কিন্তু শোনেনি। খাবার নিয়ে মেজকাকিমার ঘরে ঢুকেছিলাম আমি আর তিউ। সুন্দর, সাজানো সেই ঘরের অবস্থা দেখে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এসেছিল আমার।
সারা ঘরে আর একটা জিনিসও আস্ত নেই। সব ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভেঙে ফেলেছে কাকিমা। সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে পা দিতেই একটা পিতলের ফুলদানি আমাদের লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিয়েছিল কাকিমা। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেটা উল্টোদিকের দেওয়ালে আটকানো নাইট ল্যাম্পে লেগে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে গিয়েছিল।
প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসতে গিয়ে পায়ে একটা জিনিস ফুটে গিয়েছিল তিউয়ের। হাত দিয়ে তুলে আমায় দেখালো ও। একটা দুল, ঠিক সেই দুল যেটা আমি পেয়েছিলাম ঐ মন্দিরের কাছে। মনে পড়ে গিয়েছিল, কাকিমার কাছে ঐ দুলটা দেখার পরেই তো তিউকে কিনে দিয়েছিলাম সেটা!
ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কানে এলো, কাকিমা বলছে,
-"যা কিছু সুন্দর, যা কিছু গোছানো, তা আমার একটুও পছন্দ নয়। অগোছালো, নোংরা হয়ে থাকতেই ভালোবাসি আমি!"
আশ্চর্য, মেজকাকিমার শুচিবায়ুতার জন্য বরাবর মায়েরা তাকে কত খ্যাপায়!
আমরা এইখান থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাকিমাকে কিছুতেই ঘরের বার করা গেলই না! বিট্টুকে পাঠানো হয়েছিল তার কাছে। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি কিছু।
সদর হাসপাতালের ডাক্তার এসে ঘুমের ইঞ্জেকশান দেওয়াতে মাঝে মাঝে শান্ত থাকত একটু। কিন্তু ঘুমের রেশ কাটলেই আবার যেই কি সেই!
গতকাল ধনতেরাস ছিল। আমাদের ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আটকা পড়ে গেছি এখানে। কেউ যেন চায় না, আমরা ফিরে যাই এখান থেকে! এখানে আমাদের তার চোখের সামনে রেখে তড়পে তড়পে মারতে চায় সে!
আমাদের ইচ্ছে ছিল না এসব করার। কিন্তু মানুষের কাছ থেকে যখন সব কিছু হারিয়ে যায়, সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়ে সামনে পড়ে থাকে ধু ধু অন্ধকার, তখন ক্ষীণ আলোর রেখার দেখা পেলেই সে সেদিকে ছুটে যায়। যাচাই করে না, সে সত্যিই আলো না মরীচিকা!
এরকম অবস্থায় রাখহরি দাদুর অনুরোধে বাড়িতে ধনলক্ষ্মীর পুজোটা ছিল এমনই এক সিদ্ধান্ত। কলকাতার বাড়িতে এসব পুজো আমরা কখনো করিনি। তাই নিয়ম কানুন সব দাদুই বলে দিয়েছিল।
কোথা থেকে তুলে এনেছিল সেই অভিশপ্ত মূর্তিটা। তারপর তাতে গোবর লেপে কুলো পিটোতে পিটোতে তাকে রেখে এসেছিলাম তেমাথায়। সেখান থেকে মা লক্ষ্মীর মূর্তিকে শঙ্খ বাজিয়ে, উলু দিয়ে বাড়িতে এনে পুজো করেছিলাম। এ বাড়িতে নাকি এভাবেই অলক্ষ্মীকে বিদায় করে লক্ষ্মীকে আনা হয়।
বিনা বাধায় বাবা লেবু-লঙ্কার সুতোটা ঝুলিয়ে দিয়েছিল দরজার মাথায়। আমি অবাক হয়ে দাদুকে বলেছিলাম,
-"এতই যদি সহজ সবকিছু তবে এতদিন এসব হয়নি কেন? কেন অলক্ষ্মীকে পুষে রেখেছিলে বাড়িতে?"
দাদু উদাস দৃষ্টিতে দূরের ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
-"সেই দিনের পর একের পর এক এমন সব বাধা এসেছে যে, এই পুজো আর করাই হয়নি। যে কোনো দিনেই তো তাকে বিদায় জানানো যায় না! এই পূণ্য তিথি, পূণ্য লগ্নে আগে তো এই বাড়ির লোকেরা আর কখনও জড়ো হয়নক গো! তবে মেজবৌমাকে নিয়ে ভারী দুশ্চিন্তা হচ্ছে! অলক্ষ্মী যে তার স্থান শূণ্য রাখে না। মেজবৌমাকে কি নিয়ে যেতে পারবে তোমরা?"
নাহ, দাদুর আশঙ্কা সত্যি হয়নি। মেজকাকিমাকে আমরা নিয়ে যাচ্ছি। ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে অচেতন করে রাখা কাকিমাকে গাড়িতে তোলা হয়েছে। পাশেই বসে আছে বিট্টু। দাদুকে প্রণাম করতেই আমার চিবুকে হাত ছুঁইয়ে বলে উঠল,
-"তোমায় ঠিক তোমার সেই পিসির মত দেখতে! প্রথম দিন তোমায় দেখেই তাই আমি চমকে গিয়েছিলুম। আশীর্বাদ করি, তুমি সুখী হও। গতজন্মের না পাওয়া সব সুখ এ জন্মে তোমায় ভরিয়ে দিক।"
আমার চোখে জল চলে এলো। আমি আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে জল মুছে বললাম,
-"তোমায় আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম দাদু, অলক্ষ্মী কে? তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি সেদিন। কিন্তু উত্তর খুঁজে নিয়েছি দাদু।"
-"তাই বুঝি? তা কি জানলে আমায় শোনাও দেখি!"
মায়েদের আসতে আরো একটু সময় লাগবে। আমি দাদুর কৌতুকমাখা প্রশ্নের উত্তরে বললাম,
-"পুরাণে আছে অলক্ষ্মী হল মা লক্ষ্মীর সহোদরা, কলির স্ত্রী। তিনি সধবা, কুৎসিত, নোংরার মধ্যে থাকতে ভালোবাসেন। মর্ত্যে মা লক্ষ্মীকে পুজো পেতে দেখে তিনি হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠলেন। মা তাই তাকে শাপ দিয়ে নরকে পতিত করলেন। অলক্ষ্মীর কারণে ভায়ে ভায়ে ঝগড়া হয়, রোগ ব্যধি বাড়ে। তিনি পেঁচার রূপও নেন মাঝে মাঝে। তাই মা লক্ষ্মীর সাথে অলক্ষ্মীও সহাবস্থান করেন, এ কথা বলাই যায়! কি ঠিক বললাম তো আমি?"
কথা শেষ করে ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। এ সবই আমি ইন্টারনেটের দৌলতে জেনেছি। আমার কথা শুনে দাদু হাসতে হাসতে বলল,
-"জীবনের সারসত্য দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবে দিদিভাই?"
আমি অবাক হলাম। জীবনের সারসত্য দিয়ে ব্যাখ্যা? সেটা আবার কী? দাদু অবশ্য আমার উত্তরের অপেক্ষা করল না। নিজেই বলল,
-"কোনো মেয়ে আলাদা করে লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মী হয় না। আসলে লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মী শুধু মেয়েরাই হয় না। যার মধ্যে হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা আছে সেই অলক্ষ্মী। আর যার মধ্যে সদগুণ আছে সেই লক্ষ্মী। কিন্তু মজার কথা কি জানো? প্রতিটা মানুষের মধ্যে এই দুইই বর্তমান। কেউই পুরোপুরি লক্ষ্মী বা অলক্ষ্মী হতে পারে না। বুঝলে?"
আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। মায়েরা চলে এসেছিল। তাড়া দিচ্ছিল গাড়িতে ওঠার আগে। আমি চলে যাওয়ার আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে দাদুকে বললাম,
-"তুমি তো তাকে ভালোবেসেছিলে দাদু! তুমি তো চাইলেই তার অলক্ষ্মী বদনাম ঘোচাতে পারতে! পারতে তো তার মধ্যেকার সত্যিকারের লক্ষ্মীকে জাগিয়ে তুলতে! তুমি কেন একটু সাহসী হলে না গো?"
আমি দেখছিলাম, চশমার ওপারে থাকা দাদুর চোখ বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে উঠছে। ঠোঁটদুটো কাঁপছে! দাদু অস্ফুটে শুধু বলল,
-"তুমি.... কিভাবে? তুমি ক্কে?"
-"আমি সব জানি দাদু! সে যে আমাকেই সব বলত! তার হারিয়ে যাওয়াটা যে আমি....."
-"পিউ, আর কত দেরী করবি?"
মা ডাকছে। কথা শেষ না করেই উঠে পড়ি আমি। একটা গোটা ইতিহাসকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাই আমি বর্তমানের দিকে।
আকাশে আজ রোদ্দুর ঝলমল করছে। পেঁজা তুলোর মত মেঘ এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই মেঘে একটা নারী মুখ যেন দেখতে পেলাম আমি। তৃপ্তি পেয়েছে কি সে? মুক্ত তো হয়েছে সে। কে জানে! এর উত্তর হয়ত সে দাদুর কাছেই দেবে
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন