সুমন সাঁতরার গল্প
শেষ দেখা
******
জৈষ্ঠের তপ্ত রোদে কান পাতলেই প্রকৃতির ত্রাহি ত্রাহি ধ্বনি শোনা যাবে l সেইরকম ঝলসানো একটি দুপুরে বিপিন ঘরের চৌকাঠে সূর্য অস্ত যাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে l বয়স হয়েছে, তাই রোদে চামড়া পোড়ার জ্বালা এখন আর সে সইতে পারে না l এতদিন সে কলকাতায় কর্মরত অবস্থায় কাটিয়েছে l একটা চায়ের গোদামে মাসিক চার হাজার টাকার বিনিময়ে যৌবন পেড়িয়েছে l তবে এখন আর সে পেরে ওঠে না, বয়সের সাথে সাথে শরীরের দুর্বলতা জানান দিয়েছে l গোদামের মালিক রমেন চ্যাটার্জী এখন তাকে আজীবনের জন্য বিশ্রাম দিয়ে দিয়েছে l বিপিন বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ফল তেমন হয়নি l অন্য কোনো জায়গায় কাজ না পেয়ে শেষে গাঁয়ের ভিটে মাটির কাছে ফিরে আসতে হয়েছে l সে ঠিক করেছে যে-কটাদিন জীবনের বাকি আছে চাষবাস করেই কাটিয়ে দেবে l এছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই l
তাই আজ জমিটার কী অবস্থা দেখে আসবে ঠিক করেছে, বহুকাল হল তাতে ফসল ফলানো তো দূরের কথা পাও মাড়ায়নি সে l ইচ্ছা করেনি, সেটার কারণটা পরে জানা যাবে..
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে অনেকটাই ঢলে পড়েছে তখন বিপিন গরু দুটোকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো l ওই জমি আর এই গরুদুটোই সম্বল এখন l এছাড়া ঘরে দুটো তো মাত্র পেট, যতদিন পারবে সব্জি ফলাবে তারপর না হয় জমিটাকে বেচে দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করবে l
বরফের মত সাদা মেঠো পথের ওপর এক জোড়া পা এগিয়ে চলল l একহাতে মরচে পড়া কোদাল ও অন্য হাতে একটা লাঠি l সঙ্গে নেওয়ার মত আর কিছু তার বেঁচে নেই l
ইদানিং বিপিনের মনটা মাঝে মাঝেই খারাপ হয়ে পরে l বাঁজা বউটার শুকনো-অভুক্ত মুখটা দেখলেই তার বুকটা হু হু করে ওঠে l বাঁজা বলাটা ঠিক হবে না, একটা মেয়ে হয়েছিল তবে জন্মানোর সাথে সাথেই মারা যায় l মেয়েটার অদেখা মুখটার কথা মনে পড়লে আজও তার বুকটা কেঁদে উঠে l ওই জমির এক কোনেই তার শেষ কাজ সমাধি করা হয়েছিল l
তখন সে এখানে থাকতে পারেনি l কারণ বছরের বেশি সময় কাটাতে হত কলকাতায় l মাসে মাসে টাকা মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দিত বাড়িতে l ছুটির বালাই ছিল না বললেই চলে l কিন্তু হাড়ভাঙা পরিশ্রম সে নির্দ্বিধায় সহ্য করেছে কারণ গরিবের সংসারে সে-ই ছিল একমাত্র অন্নদাতা l
যখন বউ চার মাসের পোয়াতি তখন তাকে ছেড়ে অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই কলকাতায় চলে যেতে হয়েছিল l মনে মনে ছেলে হলে কী নাম রাখবে আর মেয়ে হলে কী নাম রাখবে সেটাও সে ঠিক করে রেখেছিলো l লক্ষীর মত একটা মেয়ে চেয়েছিল সে আবার আদর করে মিনু নামে ডাকবে সেটা স্থির করেছিল l
কিন্তু হয়েছিল ঠিক বিপরীত l ছুটির জন্য আগে থেকে আবেদন করে রাখলেও ঠিক সময়ে উপস্থিত হতে পারেনি l তখন কাজের অনেক চাপ, মালিক আদেশ দিয়ে দিয়েছে কেউ যেন এই সময় ছুটি না করে, আর সেটা মেনে না চললে তাকে একবারে ছুটি দিয়ে দাওয়া হবে l তখন রমেন ব্যানার্জীর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠ ছিল l তারপর সব কিছু শেষ হলে হাতে বাড়তি হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল,"এটা নে, বউ-মেয়ের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাস l" কিন্তু সে আর কী কাজে লাগবে! যা হবার তো হয়ে গিয়েছে, দুদিন আগেই খবর এসেছে বউ মৃতা কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে l
বিপিন বাড়ি ফিরে দেখলো, উঠানে একধারে আঁতুর ঘরে তার বউ এখনও শুয়ে আছে l তাকে দেখে বিপিনের বউ এক প্রকার আর্তনাদ করে উঠলো, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,"আমাকে ক্ষমা করো গো, আমি তোমাকে সন্তান সুখ দিতে পারলাম না l"
বিপিনেরও চোখটা চিক্ চিক্ করে উঠলো l বউকে থামিয়ে বাবার সামনে দাঁড়াতে, বাবা তামাক টানতে টানতে বলল,"মন খারাপ করিস না, যা হওয়ার হয়ে গেছে l মেয়ে তো, ছেলে হলে না হয় একটা কথা ছিল l"
কথাটা শুনে বিপিন হাঁ করে বাবার দিকে শুধু তাকিয়ে ছিল আর মনে মনে তীব্র ধিক্কার জানিয়ে ছিল l
থাক এখন ওসব কথা l সেদিন চলে গেছে, মা-বাবা দুজনেই স্বর্গীয় হয়েছেন l তবে ছেলেপুলের মুখ দেখার সৌভাগ্য তার জোটেনি l চেষ্টা অনেক করেছিল, ডাক্তার-বদ্দি-ওঝা সবই দেখিয়ে ছিল কিন্তু কোনো ফল হয়নি l শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে সব মেনে নিয়েছে l তবে লোকমুখে শোনা যায় অন্য কথা l সবাই বলে,"প্রথম বাচ্ছা তাও নাকি মৃত! ওই ঘরে আর কী নারায়ণ আসবে! সবই পূর্ব জনমের পাপের ফল l" আবার কেউ বলে,"মরা মেয়ে না ছাই! ঐ শালাবুড়োটা জ্যান্ত বাচ্চাটাকে মনে হয় পুঁতে ফেলেছিলো l কান্নার আওয়াজ অনেকেই শুনেছে l বিপিনের বাপটা একদম মেয়েমানুষ সহ্য করতে পারে না এটা কার জানতে বাকি আছে!"
কিছু কিছু কথা বিপিনেরও কানে আসে, আগে প্রতিবাদ করতো কিন্তু এখন গা সওয়া হয়ে গেছে l কথাটা সত্যি হলেও এখন আর কী বা করার আছে তার, শুধু বউয়ের কানে যাতে না যায় সেই চেষ্টাই করে যায় l
নিজের জমির কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে গোধূলিবেলা নিজের বুক পেতে দিয়েছে সর্বত্র l মাঠের একদম শেষপ্রান্তে কাটাখানিক জমি তার l তিনধারে বড়ো বড়ো নারকেল,সুপুরি, শাল গাছের লম্বা বেড়া l মধ্যিখানে ঝোপঝাড়, নানান রকম লতা, শাক পাতার সবুজে ঢাকা l
বিপিন বুঝতে পারল এটা পরিষ্কার করা তার একার কম্মো নয় l তারওপর কিছুক্ষন পর অন্ধকার হয়ে যাবে, তাই আজ থাক, কাল সকাল থেকে কাজ শুরু করবে ভেবে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই,
"ও মাঝি কোথা যাও, আমাকে একটু পার করিয়ে দেবে?"
কথাটা কানে আসতেই বিপিন পিছন ফিরল, এদিক ওদিক খোঁজা খুঁজির পর সে দেখলো অনেকগুলো শাল গাছের মাঝে একটা জাম গাছের সরু একটা ডালে বাচ্চা একটি মেয়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে l বয়স আন্দাজ আট নয় হবে, পরনে একটা সাদা কাপড় জড়ানো l যেটা সাদা থেকে ধূসর রঙে পরিণত হয়েছে l কোঁকড়ানো চুল, উজ্জ্বল চোখ l হাসি হাসি মুখ করে তার দিকেই চেয়ে আছে l
প্রথমে বিপিন একটু হকচকিয়ে গেলেও পরে নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলল,"কার মেয়ে রে তুই, এখানে একা কী করছিস?"
তার জবাবে মেয়েটি বলল,"তা তো জানি না, কার মেয়ে সেটাও জানি না l এখানে বসে থাকতে ভালো লাগে তাই বসে আছি l কিন্তু কথা বলার লোক পাইনা মাঝি l"
বিপিন ভাবলো আশেপাশের কোনো বাড়ির মেয়ে হবে l খেলতে খেলতে এখানে এসে পড়েছে, না হলে মায়ের বকা খেয়ে পালিয়ে এসেছে l বাচ্চাদের আত্মসম্মান একটু বেশিই প্রবল l
"এমন বনজঙ্গলে, একা একা কেউ বসে থাকে মা! তুই কী বাবলুর মেয়ে নাকি শ্যামলের? তোর বাড়ি কোথায়?"
"জানি না তো l আমি কিছুই জানি না l বাড়ি কী সেটাই তো জানি না l এখানেই থাকি l"
বিপিন বুঝলো বাচ্চা মেয়েটি তার সাথে মস্করা করছে l এখনকার বাচ্চারা খুবই চালাক হয়ে গেছে l তবু এমন নির্জনে মেয়েটিকে একা ছেড়ে যেতে তার মনে চাইলো না l কেমন যেন একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে অন্তরে l মেয়েটির মুখের সাথে তার স্ত্রীর মুখের এক অদ্ভুত মিল আছে l তার মনে হল মিনুই যেন বসে আছে l যদি বেঁচে থাকতো এর মতই হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই l
বিপিন বলল,"আয় নেমে আয় l চল বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি l একা একা এখানে আসবি না, সাপখোপ আছে এখানে.."
"কোথায় যাবো? আমি তো বললাম আমি এখানেই থাকি,তুমি বলো আমাকে ওপারে পৌঁছে দিয়ে আসবে কী না l সেই কবে থেকে নৌকায় বসে মাঝির অপেক্ষা করে আসছি! এতদিন কোথায় ছিলে বলো তো?"
বিপিন বুঝতে পারলো না l তাই জিজ্ঞাসা করল,"কে মাঝি, কোথায় নৌকা?"
মেয়েটি হাসি মুখে বলল,"কেন তুমি মাঝি l ওই যে তোমার হাতে নৌকার বৈঠা l এই তো আমি নৌকাই বসে আছি দেখো l চলো আর দেরি কোরো না, এখন হাওয়া ভালো আছে, তোমাকে বেশি কষ্ট করতে হবে না l এই দেখো হওয়ায় আমি কেমন দুলছি l"
মেয়েটির কথায় বিপিন নিজের হাতে দিকে তাকাতে জীর্ণ কোদাল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না l মেয়েটি নিশ্চই তার সাথে ঠাট্টা করছে, হাওয়ার সাথে সাথে জাম গাছটা দুলছে তাতে সেটাকে হয়তো নৌকা মনে করে আনন্দ পাচ্ছে l
বিপিন শেষ চেষ্টা করে বলল,"অনেক হয়েছে চল এবার, সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তারপর দেখবি একা একা আর বাড়ি ফিরতে পারবি না, তখন কাঁদলেও কাউকে খুঁজে পাবি না l
মেয়েটির কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না l একমনে কিছু যেন সে ভাবছে l গাছের পিছনে রক্তিম সূর্যের আলো শেষবারের মত কিরণ বিকিয়ে দিয়ে যাচ্ছে l
"আয় নেমে আয় বলছি l আয় মা l"
"বললাম তো বাড়ি কী জিনিস আমি জানি না l অনেক বছর ধরে এখানেই অপেক্ষা করে আছি l এখন আমাকে ওপারে যেতে হবে, ওটাই আমার গন্তব্য আবার তোমার মতে বাড়িও হতে পারে l"
বিপিনের কেমন যেন ভয় হতে শুরু হল l সে হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারছে না l মেয়েটি কী পাগল! নাকি বড়োদের এমন বিভ্রমে ফেলে আনন্দ পায় l হয়তো এটাই তার খেলার রসদ l
বিপিন বলল,"কী যা তা বলছিস l তোর বাবার নাম কী বলতো? বললাম না গাছ থেকে নেমে আয়, কথাটা কানে যায়নি?"
"কানে আসবে না কেন? তবে তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা l ঐসব ছেড়ে নৌকায় ওঠো l আমাকে পৌঁছে দেবে চলো l"
বিপিন আর রাগ চেপে রাখতে পারলো না, সে চিৎকার করে বলল," কী তখন থেকে নৌকা, নৌকা করছিস? কথায় পৌঁছে দিয়ে আসবো শুনি?
কিন্তু উত্তর পাওয়া যাবে না এই ভেবে বিপিন হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ির দিকে মুখ করতেই, পিছন থেকে আওয়াজ এল,"বৈতরনী নদী l"
বিপিনের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো, তড়িৎ বেগে মুখ ফেরালো কিন্তু কেউ নেই সেই ডালে l সূর্য পুরোপুরি অস্ত চলে গেছে l সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে সে একা দাঁড়িয়ে রইল সেই খেয়া ঘাটে..
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন