ইমন ভট্টাচার্যের গদ্য

সত্তার যাত্রাঃ মেলাঙ্কলিয়া থেকে সিজোফ্রেনিয়া



সেই কবে এইচ. এস. -এ পড়তে পড়েছিলাম ‘সলিটারি রিপার’ কবিতাটা। “Stop here or gently pass”। একটি মেয়ে পার্বত্য উপত্যকায় গান গাইছে। একাকী মেয়েটিকে দেখছেন কবি, শুনছেন তার গান। বুলবুলের চেয়েও মিষ্টি গলার সেই গান। তা কী গাইছে মেয়েটি- হয়ত কোনো পুরোনো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সন্তাপ, অথবা নিছক বর্তমানের কোন গান- “Some natural sorrow, loss or pain / That has been xxx may be again।” সেই গান শুনতে শুনতে আরও দূরের উপত্যকায় চলে গেলেন কবি, গান আর শোনা গেলনা, গান বাজতে থাকল তার হৃদয়ে।
ভাবার কথা, এই গানটিকে melancholy’ বলে বিশেষিত করেছেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ। এই melancholy  বা কোমল বিষাদ রোমান্টিক সাহিত্যের একটি কুললক্ষ্মণও বটে। আমরা এই প্রবন্ধে এই মিলানকোলি- কে চিহ্নিত করার চেষ্টা করব, খোঁজার চেষ্টা করব বারংবার, কীভাবে ধারণাটি ক্রমবিবর্তিত হয়েছে ইতিহাসের পর্বে।
রোমান্টিকতার আগের যুগে যাকে বলে প্রি- রোমান্টিসিজম- সে যুগে আসন্ন রোমান্টিকতার কতগুলি লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছিল। তার মধেয় একটা হল সেনসিবিলিটি। সেনসিবিলিটি এক ধরণের তীব্র স্পর্শকাতরতা। মানসিক আবেগ, প্রক্ষোভএর বাড়াবাড়ি প্রভাবিত করে শরীরকেও। মানসিক পেইন, শারীরিক যন্ত্রণা যার উপশম প্রায় অসম্ভব। আঠারো শতকের ইউরোপে এফিমোনিজমের সঙ্গে এই সেন্সিবিলিটিকে এক করে দেখা হতে থাকে। এফিমিনেট পুরুষ এবং ম্যাসক্‌লাইন নারী এযুগের এক ফসল। এই যুগটাকেই লোকে সেন্সিবিলিটি দিয়ে চিহ্নিত করে। সে আবেগ সামলানো যায় না, তার থেকে রোগ ও বিকার। তাই সেন্সিবিলিটি।
এই সেন্সিবিলিটি কিন্তু রোমান্টিকতার পূর্ববর্তী। সেন্সিবিলিটি রোমান্টিক বাচনে হয়ে ওঠে মেলানকোলি। যে বিষয়ের কথা দিয়ে এই লেখার সূচনা করেছি।
জীবনের ক্ষয়, সুখ, দুঃখের কথা ওয়ার্ডসওয়ার্থের ক্কবিতায় গান হয়ে উঠে আসছিল। যে গান দূরে চলে গেলে শোনা হয়ত আর যায়না, কিন্তু হৃদয়ে অনুরণিত হতে থাকে। তাই মেলানকোলিকে তিনি দেখেছিলেন এর মিষ্টতা, এর সৌন্দর্যের জায়গা থেকে, এই কথা বলা চলে।
কিন্তু রোমান্টিকতার বাচনে কী সর্বত্র একইভাবে দেখা হয়েছে মেলাঙ্কোলিকে? কীট্‌সের Ode on Melancholy-তে তিনটি স্তর আছে। আছে বিষহ্রদ লিথির কথা, যা খেলে মানুষ সকল স্মৃতি ভুলে যায়। এই বিস্মরণীর কৃপায় সব বিস্মৃত হয়ে মানুষ উদ্বেগ বা অ্যানাস্তুইশের বশে নতিস্বীকার করে। তখন পরিত্রাত্রী হয়ে আসে মেলাঙ্কলিয়া। সে এক সেমি শান্তি এনে দেয়। “That glut thy sorrow on a morning rose” দুঃখকে সে সম্পদে পরিণত করে। কিন্তু এখানেই কবিতাটি শেষ হয়ে যায় না। তৃতীয় স্তবকে মেলাঙ্কলিকে অসামান্য স্তুতি করেও শেষে গিয়ে কীট্‌স বলেন-
“His soul shall taste the sadness of 
her might
And among her cloudy trophies hung.”
অর্থাৎ, রোমান্টিকরাও যে মেলাঙ্কলিকে সবসময় সোজা নজরে দেখেছেন, তা নয়। মেলাঙ্কলির ভেতর একটা আশঙ্কা সবসময়ই ছিল। সমালোচনাও ছিল।
এই সেই প্রবাদপ্রতিম মেলাঙ্কলি, যা রোমান্টিকদের উচ্চারণে প্রবাদ হয়ে গেছে। বোঝা দরকার, যা মির্যািকল্‌ করতে সক্ষম, যা ভোরের গোলাপে শিশিরের মত স্থির ও চঞ্চল, তার একটা আভিজাত্য আছে। বৃটিশ রোমান্টিসিজমের যে অ্যান্টিকিটি, তা সম্ভব করে তুলেছিল এই স্পর্শকাতরতা, দুঃখ- সুখ মেশানো অনুভব।
সেন্সিবিলিটি উপন্যাসটিতেই তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ক্লাসের একটা গল্প আছে এখানে। আভিজাত্যের সঙ্গে মেলাঙ্কুলির সম্পর্ক আছে। রোমান্টিসিজম থেকে রিয়্যালিজম হয়ে আধুনিকতার দিকে যাত্রায় ভাবনা ও অনুভূতির অনেকগুলো স্তর পেরিয়ে গেলাম আমরা। আধুনিক লেখকদের মধ্যে প্রধানতঃ ফ্রয়েডই আমাদের আলোচ্য। ফ্রয়েডের সন্দর্ভে মেলাঙ্কলিকে মোর্নিং-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। মোর্নিং প্রধানত প্রেমের পাত্রী (object) কে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা তীব্র, কিন্তু এতে করে ব্যক্তি নিজের আত্মবোধ, আত্মপরিমাপ হারিয়ে ফেলে না। মেলাঙ্কলির ক্ষেত্রে তা হারিয়ে যায়। নিজেকে সে সম্পূর্ণ নিঃস্ব বলে বোধ করে।  তার ইগো, ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে যা চালক শক্তি স্বরূপ, আহত হয় এবং সে নিজেকে সম্পূর্ণ মূল্যহীন মনে করতে থাকে। এর সঙ্গে ‘লাভ অবজেক্ট’ কে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা তো থাকেই। মূল কথা রোমান্টিক সন্দর্ভে যা ছিল একটি বিশেষ গুণ, বৈশিষ্ট্য, আধুনিক সন্দর্ভে তাকে একটি রোগ হিসেবেই দেখছেন ফ্রয়েড। মেলাঙ্কলিতে যেহেতু ইগোর ডিবেসমেন্ট ঘটে, তাই বহু ক্ষেত্রেই তা চলে যায়, ইনফ্যাটাইল নিউরোসিসের দিকে। এই সূত্রটি আমরা মাথায় রাখব। 
আচ্ছা, বাংলা কবিতায় সে অর্থে মেলাঙ্কোলি নেই কেন? তা কী কেবলই বিদেশী এক অনুভূতির আলেখ্য বলে? অথচ বিদেশ থেকে কী না আমদানি হয়েছে বাংলা সাহিত্যে!
রবীন্দ্রনাথ যদিও জাত রোমান্টিক, তবু মেলাঙ্কলি বলতে যা বোঝায়, তা তাঁর কবিতায় বা গানে মিলবে না। তাঁর দুঃখের মধ্যেও থাকে ক্যাথারসিস, মোক্ষণ। দুঃখ এক বৃহৎ অস্তিত্বের কাছে ছোট হয়ে যায়। কখনও তা জীবনদেবতা, কখনও ঈশ্বর। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘দুঃখ’ প্রবন্ধে বলছেন- “ঈশ্বরের মধ্যে যেমন পূর্ণতা আছে, আমার মধ্যে তেমনই পূর্ণতার মূল্য আছে- তাহাই দুঃখ- সেই দুঃখই সাধনা, সেই দুঃখই তপস্যা, সেই দুঃখেরই পরিণাম আনন্দ, মুক্তি ঈশ্বর।”
রাবীন্দ্রিক চেতনা উপনিষদ অধ্যুষিত। দুঃখ সেখানে মুক্তিরই অনুষঙ্গ। তাঁর কবিতার, গানের সব দুঃখ তাই কোনো না কোনো উত্তরণে গিয়ে শেষ হয়। বাংলা সাহিত্যে ‘দুঃখবাদী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন ‘যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত’। তাঁকে ‘রবীন্দ্রসমসাময়িক’ বা ‘রবীন্দ্রোত্তর’ ধরণের মার্কায় ফেলার প্রয়োজন দেখিনা। তাঁর ‘বহ্নিস্তোত্র’ বা ‘লোহার ব্যাথা’-য় যে দুঃখ দেখি তা যন্ত্রণাময় জাগতিক দুঃখ। ‘দুঃখবাদী’ কবিতায় তিনি এই দুঃখকে এক বিশ্বময় রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন-
“বাহিরের এই প্রকৃতির কাছে মানুষ শিখিবে কীবা?
মায়াবিনী নরে বিপথযাত্রী করেছে রাত্রি দিবা    
চটক বা চখা কী জানে প্রেমের? বকে কি
শিখিবে ধর্ম?
সহজ স্বাধীন হিংস্র শ্বাপদ বুঝাবে 
জীবন মর্ম!

“বজ্র লুকায়ে রাঙা মেঘ হাসে পশ্চিমে আনমনা
রাঙা সন্ধ্যার বারান্দা ধারে রঙিন বারাঙ্গনা।
খাদ্যে খাদকে বাদ্যে বাদকে প্রকৃতির ঐশ্বর্য
ষড়ঋতু ছলে ষড়রিপু খেলে কাম হতে মাৎসর্য।”

প্রকৃতি, বিশ্বনিয়মকেই প্রশ্ন করছেন এখানে। ন্যাচরালিস্ট জীবনদৃষ্টির বিপরীত তাঁর দর্শন। আরেকটু এগোলে দেখব, তিনি চিন্তায় অনেকবেশি রিয়ালিস্টদের সমীপবর্তী-
“কোথা সে অগ্নিবাদী
জ্বালিয়া সত্য, দেখাবে দুখের নগ্ন মূর্তীখানি!
কালোকে দেখাবে কালো করে আর বুড়োকে
দেখাবে বুড়ো,
পুড়ে উড়ে যাবে বাজারের যত বর্ণ ফেরানো গুঁড়ো।”
(ঘুমের ঘোরে, চতুর্থ ঝোঁক)

তাই এখানে রোমান্টিক মেলাঙ্কলি আশা করা যায়না। বরং এই দুঃখ বা দুখবাদ মেলাঙ্কলির বিপরীত। 
এপর্যন্ত এসে ‘আধুনিকতাবাদ’-এর সমুদ্রে নেমে পড়া ভালো। সলিটারি রিপারের স্বাদু বিষণ্ণতা বা কীট্‌সের মেলাঙ্কলির অর্চনা এখানে মিলবে না বরং আধুনিকতাবাদের পুরোধাপুরুষ ফ্রয়েডের কথা বলি। সে অনুযায়ী মেলাঙ্কলিয়ায় এক ধরণের বিশ্লেষণ হয়। রোগী আদি নার্সিসিজমে ফিরে আসে। ‘On the introduction of Narcissism’-এর সূত্রে এও বলা যায় নার্সিসিজমের একটি ফলশ্রুতি হল সিজোফ্রেনিয়া। সিজোফ্রেনিয়ার একটি লক্ষণ মেগালোমেনিয়া হলে অপরটি হল সমাজ থেকে দূরে থাকার ইচ্ছা, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। মেলাঙ্কলিয়া থেকে সিজোফ্রেনিয়া খুব দূরে নয়। আধুনিক মনস্তত্ত্বেও এরা নিকটবর্তী , ফ্রয়েডকে বাদ দিয়েও বলা চলে। 
সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলছে, জীবনানন্দ বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি জীবনানন্দের কথা দিয়েই মূলতঃ শেষ করব। “আট বছর আগের একদিন” কবিতায় উল্লিখিত চরিত্রটির আত্মহননের কারণ কী সে নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকবে। কবিতায় একটি মানুষের আত্মহননেচ্ছা, অন্যদিকে মাছি, মশা, ব্যাঙের অদ্বিধ জীবনবাসনা- এ দুয়ের মাঝে এক দ্বন্দ্ব চলছে। ঘটনা হল, কবিতার কথক কিন্তু প্রায় শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছে, মূল চরিত্রের আত্মহত্যার কারণ, তার উপলব্ধি- “যে জীবন, ফড়িঙের দোয়েলের মানুষের জীবনের সাথে তার হয়নাকো দেখা।” অর্থাৎ, কীট, পতঙ্গ প্রকৃতির সাথে লগ্ন হয়ে রয়েছে। তা-ই তাদের জিজীবিষার উৎস। কিন্তু মানুষ অ্যালিয়েনেটেড, বিযুক্ত ফলে ক্লান্ত এবং আত্মনাশপ্রবণ। এই ক্লান্তির কথাই উঠে এসেছে কবিতায়। এক বিপন্ন বিস্ময়, যা আমাদের, আধুনিক মানুষকে ক্লান্ত করে। ‘বোধ’ কবিতায় এই অ্যালিয়েশন চরম রূপ নিয়েছে। চাষার সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে, কোন কিছুর সঙ্গেই সংযুক্ত নয় এই সাধারণ মানুষ। নষ্ট গলা, পচা চালকুমড়োর ছাঁচে তার জীবন বর্জিত, নিষ্ফলা, নষ্ট। বিযুক্তি এবং অযথার্থ আত্মপরিমাপ এ দুইই জীবনানন্দের দুটি কবিতায় আছে। সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয় এরা। পরবর্তী সময়ে শহীদ কাদরির কবিতায়, তুষার রায়ের বা ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় আমরা এই সিম্পটমগুলো ফিরে ফিরে পাই। ফিরে পাই শীর্ষেন্দুর ‘ঘুণপোকা’ বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কুবেরের বিষয়- আশয়’- এর মত উপন্যাসে। নির্মম ক্ষয় ও যন্ত্রণার ভেতর শৌখিন মেলাঙ্কলি কোনভাবে এসে প্রবেশ করেনি। ইংরেজি সাহিত্যেও সিলভিয়া প্লাথের কবিতাকে কী মেলাঙ্কলি বলা চলে?
উত্তরাধুনিক পৃথিবীতে ক্যাপিটালিজম ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পেষাই মানুষের একটি প্রধান লক্ষণ হল সিজোফ্রেনিয়া। সব সেল্ফই এমতাবস্থায় সিজো সেল্ফ। তাই শিল্পের ভেতর এত টেনশন, এত অস্থিরতা। মেলাঙ্কোলিয়া থেকে সিজোফ্রেনিয়ায় পৌঁছে, স্বপ্নে দেখতে ইচ্ছা করে নদীর ধারে বাগানে বসে একাকী বাঁশি বাজানোর কথা। কিন্তু তা ইতিহাসের, ফলে দূর- অস্ত।

মন্তব্যসমূহ

পাঠকপ্রিয়

সেলিম মণ্ডলের গুচ্ছকবিতা

সোনালী চক্রবর্তীর কবিতা

সৌমিতা চট্টরাজের কবিতাগুচ্ছ

সৌভিক গুহসরকারের কবিতা

মধুমিতা রায়ের কবিতাগুচ্ছ